প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানি ঢাকা পৌঁছান

আপডেট: ডিসেম্বর ২১, ২০২৩, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ


নিজস্ব প্রতিবেদক:


২১ ডিসেম্বর ১৯৭১ : এদিন ডিসেম্বর নাটোর মুক্ত দিবস। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান
সেনাবাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করলেও নাটোর ছিল অবরুদ্ধ। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর দ্বিতীয় হেড কোয়ার্টার হওয়ার কারণে নাটোরে অবস্থান করছিল পাকিস্তান সেনা বাহিনীর প্রায় আট হাজার সেনা সদস্য। বিজয় দিবসের পাঁচদিন পরে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী নাটোরে মিত্র বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের পর নাটোর হয় মুক্ত। শুরু হয় বিজয় উল্লাস।

২৬ মার্চের কাল রাতে ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইটে অসংখ্য বাঙালি হত্যার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ২৯ মার্চ ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে এক প্লাটুন সেনা সদস্য পথ হারিয়ে লালপুর উপজেলার ময়নায় ঢুকে পড়ে। পুলিশ, ইপিআর, আনসার সহযোগে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধে মেজর আসলাম রাজাসহ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নয়জন এবং প্রায় অর্ধশত বাঙালি শহিদ হন। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ।

সম্ভবত ময়না যুদ্ধের প্রতিশোধ এবং যোগাযোগ সুবিধার কারণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নাটোরে তাদের দ্বিতীয় হেড কোয়ার্টার প্রতিষ্ঠা করে। সমগ্র উত্তর বঙ্গে যুদ্ধ নাটোর থেকে পরিচালনা করা হতো। শহরের ফুলবাগানে সিও অফিসে স্থাপিত হয় প্রধান কার্যালয়। এ ছাড়া তৎকালীন গভর্নর হাউজ, রানী ভবানী রাজবাড়ী, আনসার ক্যাম্প, পিটিআই এবং এনএস কলেজে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অবস্থান নেয়।

মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন বলেন, শহরের বিভিন্ন পাকিস্তানের সেনা বাহিনী অবস্থান নেওয়ায় নাটোর শহর ১৩ এপ্রিলের পর থেকে হয়ে পড়ে কার্যত অবরুদ্ধ। ইতোপূর্বে নাটোর টাউন পার্কে খন্দকার আবু আলীর নেতৃত্বে গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ এবং নাটোর রিক্রিয়েশন ক্লাব থেকে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কার্যক্রম মন্থর হয়ে পড়ে। নাটোর শহরে সেনাবাহিনীর শক্ত অবস্থানের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা নাটোর ছাড়তে শুরু করেন বলেন জানান মুক্তিযুদ্ধের এ অঞ্চলের অন্যতম সংগঠক আব্দুর রউফ। তিনি বলেন, নাটোরের মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

মুক্তিযোদ্ধা কসিম উদ্দিন বলেন, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের পর মুক্তিযোদ্ধারা নাটোরে ফিরে আসতে শুরু করেন। শহরের বিভিন্ন স্থানে খণ্ড খণ্ড বিজয় মিছিল হতে থাকে। ১৩ এপ্রিল থেকে ১৫ ডিসেম্বর নাটোর শহর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ১৬ ডিসেম্বর থেকে তাঁরা নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এ সময় উত্তর বঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে সেনাবাহিনী নাটোরে আসতে থাকে। নাটোরে আসেন মিত্র বাহিনী।

পরে ২১ ডিসেম্বর তৎকালীন গভর্নর হাউজ তথা বর্তমান উত্তরা গণভবনে ১৪১ জন অফিসার, ১১৮ জন জেসিও, পাঁচ হাজার ৪৫০ জন সিপাহী ও এক হাজার ৮৫৬ জন প্যারামিলিশিয়া বাহিনী নিয়ে পাকিস্তান সেনা বাহিনীর অধিনায়ক মেজর জেনারেল নজর শাহ্ ও ব্রিগেডিয়ার নওয়াব আহম্মেদ আশরাফ আত্মসমর্পণ করেন।

আত্মসমর্পণ দলিলে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন মিত্র বাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল লসমন সিং। ১০ হাজার ৭৭৩টি অস্ত্রসহ জমা হয় ট্যাংক, মর্টারসহ অসংখ্য সাজোঁয়া যান। সকালের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কোনো সিভিলিয়নের প্রবেশাধিকার ছিল না বলে জানান ওই সময়ের যুবক ও বর্তমানে ব্যবসায়ী সাদেকুর রহমান। একই মত পোষণ করেছে, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নাটোর জেলা শাখার কমান্ডার আব্দুর রউফ।

আত্মসমর্পণের খবর ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। সারাদিন ধরে শহরে চলে বিজয় মিছিল আর মুক্ত আকাশে গান ফায়ার। দিবসটি পালনে ২১ ডিসেম্বর নাটোরে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ