মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান নি শিক্ষক নওশের

আপডেট: ডিসেম্বর ৯, ২০১৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

তানোর প্রতিনিধি



রাজশাহীর তানোরের পাকবাহিনীর ক্যাম্পগুলো রেকি করে তাদের অবস্থান মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করতেন নওশের উদ্দিন। এইজন্য তার বাড়িতে কয়েক বার হামলা করে রাজাকার বাহিনী। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান তিনি। জীবনবাজি রেখে এই কাজ করতেন তিনি। তবুও স্বাধীনতার ৪৫ বছর পার হলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পান নি নওশের উদ্দিন।
নওশেরের বাড়ি তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নের কচুয়া দক্ষিণপাড়া গ্রামে। তিনি মরহুম আমিরুদ্দিনের ছেলে। পেশায় শিক্ষক।
তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭১ সালে রাজশাহী সিটি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের প্রথমবর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। লেখাপড়া শেষে ১৯৭৮ সালের ১ নভেম্বর ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে চিনাশো সিনিয়র আলিম মাদ্রাসায় যোগদান করেন। দীর্ঘ ৩৬ বছর শিক্ষকতা করে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের ৩১ তারিখে অবসরে যান।
২৫ মার্চের কালো রাতে শুরু হয় পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যা। ৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ শুনে তখনি তিনি দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে গ্রামে গ্রামে রাজাকারদের নির্যাতন দেখে চুপ থাকতে পারেন নি তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ১৯৭১ সালে আগস্ট মাসের প্রথম দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হয়ে ভারতে প্রবেশ করার জন্য রওনা দেন। পথে তার এক আত্মীয় গ্রামে বসে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান করে তাদের সাথে কাজ করার জন্য তাকে ফেরত পাঠিয়ে দেন।
গ্রামে ফিরে ৭ নম্বর সেক্টরের এক অংশের মুক্তিযোদ্ধা দলের সাথে নওশের উদ্দিনের দেখা হয়। তখন পরিচয় হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা মহসিন, হাবিবুর, বাবু, মোসলেম, আদিবাসি মুক্তিযোদ্ধা ছোটাই মাঝি, মুক্তিযোদ্ধা সহিদ মুঞ্জর, নুরুল ইসলামসহ আরো অনেকের সাথে। ওই সময় নিরাপত্তার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা অনেক সময় নিজেদের পরিচয় দিতেন না। পরবর্তীতে নওশের উদ্দিন স্থানীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় শুরু করেন করেন ট্রেনিং এবং একইসাথে শক্রর ঘাঁটিতে সক্রিয় আক্রমণ করতে থাকেন। এসময় তাদের সঙ্গে ছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এসএমজি, এসেলার, হ্যান্ড গ্রেনেড ও মাইন।
নওশের উদ্দিন জানান, ওই সময় স্থানীয় মানুষ হিসাবে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় দিনের বেলা শক্র ক্যাম্প রেকি করে নকশা গ্রহণসহ বিভিন্ন তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সরবরাহ করা। এই কাজ খুব ঝুঁকি ছিল। তবুও দেশের কথা ভেবে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে তিনি এই কাজ সফলভাবে করতেন। স্থানীয় মানুষ হিসেবে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন। ডাক্তার ডেকে এনে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করাতেন।
স্মৃতিচারণে নওশের উদ্দিন বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কর্মকা- এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগের কারণে শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী আমার বাড়ি লুট করে। এইসময় হানাদারবাহিনী তার বাড়িতে এসে বাড়ির আসবাবপত্র ও রেডিও নিয়ে গিয়েছিল। এর এক সপ্তাহ পর রাজাকাররা আবার তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে না পাওয়ায় গালিগালাজ করে চলে যায়। রাজাকার বাহিনীর ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে তার ভাগ্নিপতিকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে তারা। তার লাশ আর পাওয়া যায় নি।
তিনি আরো জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের ক্যাম্পটি আক্রমণ করে উড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। ওই সময় রাকাজাকার ক্যাম্পে গান পাউডারের আগুন দিতে গিয়ে তার বাম হাতের এক অংশ ঝলসে যায়। সেই ক্ষতচিহ্ন এখনো রয়ে গেছে।
চার ছেলে দুই মেয়ের জনক নওশের উদ্দিন (৬২) আফসোস করে বলেন, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও তার কোনো মূল্যায়ণ হয়নি। রাষ্ট্রীয় কোনো সম্মান পাননি তিনি। তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি ও সম্মান দাবি করেন।
কচুয়া স্কুলপাড়ার আলহাজ্ব তৈয়ব আলী ও পাঁচন্দর ইউপি আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান জানান, আমরা এলাকার জনসাধারণ শিক্ষক নওশের উদ্দিনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ডাকি। কেউ মাস্টার বলে ডাকে না।  এক দিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টিভিতে এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দ্বিগুণ করার ঘোষণা দেন। সেই সময় আমাদের কাছে বসে টিভি দেখছিলেন মুক্তিযোদ্ধা নওশের উদ্দিন। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণার পর আমরা মজা করে নওশেরের কাছে কাছে মিষ্টি খেতে চাইলে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, আজো তার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম নেই। তখন থেকে আমরা জানতে পারি, মুক্তিযুদ্ধ করেও নওশের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পায় নি। আমাদের  গ্রামবাসির দাবি নওশের উদ্দিনের নাম তালিকাভুক্ত করে তাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হোক।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল ওয়াহাব জানান, নওশের উদ্দিন একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘ দিনেও তার নাম তালিকাভুক্ত হয় নি। মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তার নাম তালিকাভুক্তির দাবি জানান তিনি।