সড়কে কুড়িয়ে পাওয়া ২৫ লাখ টাকা ফেরত দিলেন ট্রাকচালক বাবু

আপডেট: মে ২, ২০২২, ৯:১৩ অপরাহ্ণ


নাটোর প্রতিনিধি:


ঢাকার গাজীপুর থেকে ট্রাক চালিয়ে নাটোর আসার পথে রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া ২৫ লাখ টাকা ফেরত দেয়া সেই ট্রাকচালক টাকা ফেরৎ দেয়ার সময় গ্রহণ করেননি কোনো উপহার। তার কাজে খুশি আর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন তার পরিবার, গাড়ির মহাজন’ আর এলাকাবাসী। ট্রাকচালক বাবু রোববার বিকেলে পুলিশের মাধ্যমে নাটোর সদর থানা ভবনে এই টাকা প্রকৃত মালিকের হাতে তুলে দেয়। বাবু নাটোর শহরের পুলিশ লাইনের পার্শ্বে বড় হড়িশপুর গ্রামের বাসিন্দা।
তার বাবা ২২-২৩ বছর আগে যাত্রীবাহী বাসের সুপারভাইজার হিসাবে কাজ করতেন। তার পরিবারে দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি মেজো। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। তার ছোট এক বোন এবং এক ভাই রয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, শুক্রবার সকালে বাবু ট্রাক চালিয়ে গাজীপুর থেকে নাটোরের দিকে আসছিলেন। পথে গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় মহাসড়কে টাকাভর্তি একটি ব্যাগ কুড়িয়ে পান। ব্যাগে ২৫ লাখ টাকা ছিল। টাকার ব্যাগ নিয়ে তিনি নাটোর সদর থানায় আসেন এবং বিষয়টি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাছিম উদ্দিনকে জানান। ব্যাগসহ টাকা পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়। পরে ওই টাকার প্রকৃত মালিক গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বরইগ্রাম এলাকার ফল ব্যবসায়ী লিটন মিয়া। তার গাজীপুর জেলার রানীগঞ্জ বাজারে মৌসমী ফল ভাণ্ডার নামে একটি আড়ৎ রয়েছে।
ট্রাক চালক বাবু জানান, তার বয়স যখন ১০-১২ বছর। সেই সময়ে বাবার কোমনে সমস্যা হয়। ওই কারণে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ ত্যাগ করতে হয় তার বাবাকে। এমন অবস্থায় অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরেন তিনি। শুরু করেন স্থানীয় মিরাজ নামে এক চালকের ট্রাকের হেলপার হিসেবে কাজ করা। আজ তিনি নিজেই চালক হিসাবে কাজ করে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসাবে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করছেন। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বাবু জানান, টাকা পাওয়ার সময়ে তার সাথে ছিলেন হেলপার শফিক পাটোয়ারী। টাকার ব্যাগ পাওয়ার ৫ মিনিটের মধ্যে তিনি তার মহাজন’ শাহনেওয়াজকে ফোনে বিষয়টি জানান। শাহনেওয়াজ তাকে বলেন, নাটোরে ফিরে আসতে। একই সাথে শাহনেওয়াজ নাটোর সদর থানার পুলিশকে বিষয়টি জানান। সারারাত গাড়ি চালিয়ে পরের দিন সকালে নাটোরে পৌছেন তিনি। এরপর মহাজনের সাথে পরামর্শক্রমে ৯৯৯ এ ফোন দিয়ে গাজীপুরের সব থানায় তিনি নিজে বিষয়টি ইনফর্ম করেন। পাশাপাশি সদর থানার ওসিও যোগাযোগ করেন গাজীপুরের বিভিন্ন থানায়।
এক প্রশ্নের জবাবে বাবু জানান, টাকা ফিরে পাওয়ার পর তাকে উপহার হিসাবে বেশ কিছু টাকা হাতে দিতে চেয়েছিলেন লিটন মিয়া। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। সেই টাকাও ফিরিয়ে দিয়েছেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে বাবু জানান, তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। কিন্তু জেএসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি। এর মাঝে পঞ্চম শ্রেণিতে স্থানীয় এক মাদ্রাসায় তিনি এক বছর পড়ালেখা করেন। নিজের শিক্ষা, পারিবারিক শিক্ষা,বাবা-মার আদেশ, ওস্তাদদের শিক্ষা তাকে সততার সাথে চলতে এবং টাকার লোভ না করতে শিখিয়েছে।
বাবুর কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তার বাবা কনুমিয়া এবং স্ত্রী মীম আক্তার। তাদের দাবি, কোনো লোভ না করে ওই টাকাগুলো ফেরত দেওয়াতে তারা খুশি। অন্যের টাকার তারা লোভ করতে চাননা। সততা এবং নিষ্ঠার সাথে পরিশ্রম করে জীবন যাপন করতে চান। অন্যের টাকার ওপর তাদের কোনো লোভ নেই।
প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বাবুর ওস্তাদ মেরাজ আলী জানান, বাবুর বয়স যখন দশ -বারো বছর তখন বাবু তার হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করে। এখন সেই বাবু চালক হয়েছে। বাবু একজন সৎ, পরিশ্রমী এবং নিরহংকারী মানুষ দাবী করে তিনি বলেন,এর মাধ্যমে সে জীবনে সফলতা অর্জন করবে এমন প্রত্যাশা করেন তিনি।
ট্রাক মালিক শাহনেওয়াজ জানান, টাকা ফেরত পাওয়া লিটন মিয়া তাকে জানিয়েছেন, ওই টাকা হারানোর পর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তার সেই বন্ধুরা মনে করেছিল, ওই টাকা লিটন মিয়া আত্মসাৎ করে এমন নাটক সাজিয়েছে। টাকাগুলো ফেরত না পেলে তার বসতবাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে ওই টাকা শোধ করতে হতো দাবি করে লিটন তাকে বলেছেন, বাবুর এমন সততায় মুগ্ধ তিনি। বাবুর উত্তরোত্তর উন্নতি এবং সমৃদ্ধির জন্য দোয়া করেছেন লিটন মিয়া।
বাবুর সততায় পাশাপাশি তাঁর ট্রাক মালিক শাহনেওয়াজের সততা এবং উদারতায় খুশি তিনিসহ নাটোরবাসীও। বর্তমান অসৎ, দুর্নীতিবাজ আর ভেজালের ভিড়ে এমন বাবুর সততায় নাটোরবাসী গর্বিত। বাবুর উত্তরোত্তর মঙ্গল এবং শুভ কামনা করেন ওসি নাছিম আহমেদ।
নাটোর সদর থানা-পুলিশের কাছ থেকে খবর পেয়ে গাজীপুর জেলা পুলিশ টাকার মালিককে খুঁজে বের করে। ওই টাকার প্রকৃত মালিক হলেন গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বরইগ্রাম এলাকার লিটন মিয়া। তিনি রোববার দুপুরে নাটোর থানায় আসেন। সেখানে যাচাই-বাছাই শেষে বেলা তিনটার দিকে লিটন মিয়ার হাতে টাকা তুলে দেন ট্রাকচালক বাবু।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ