২০০ কোটি টাকার সোনা চোরাচালানে খুন এমপি আনোয়ারুল আট দিনের রিমান্ডে ৩ আসামি, জিহাদ ১২ দিনের

আপডেট: মে ২৫, ২০২৪, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

 

সোনার দেশ ডেস্ক:


২০০ কোটি টাকার সোনা নিয়ে দ্বন্দ্বেই ভারতের কলকাতায় খুন হয়েছেন ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। এই হত্যাকাণ্ডের ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ তঁর বন্ধু ঠিকাদার আক্তারুজ্জামান শাহীন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।

পুলিশ বলছে, আক্তারুজ্জামান শাহীন সীমান্তপথে ভারতে সোনা পাচার করতেন। চোরাই সোনা সীমান্ত পার করতে সহায়তা করতেন সংসদ সদস্য আনোয়ারুলের ঘনিষ্ঠ লোকজন। বিনিময়ে তাঁরা কমিশন পেতেন। গত ছয় মাসে সোনার একাধিক বড় চালান মেরে দেওয়া হয়। এসব চালানে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সোনা ছিল। এতে ক্ষিপ্ত শাহীন সোনা ফিরে পেতে সংসদ সদস্যকে বারবার চাপ দেন এবং বিকল্প মাধ্যমে চোরাচালান করতে থাকেন। এ নিয়েই দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্ব নিরসনে কয়েক মাস ধরে তাঁরা বসতেও চেয়েছিলেন। শেষ সময়ে পরিকল্পনা বদলে আনোয়ারুলকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন শাহীন।

পুলিশ জানায়, আক্তারুজ্জামান শাহীন ১৯৮৮ সালে ওপি ওয়ান লটারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তবে বেশির ভাগ সময় তিনি দেশেই থাকতেন। দুবাই থেকে অবৈধভাবে আনা সোনা বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করতেন।

সোনা চোরাচালানের অভিযোগের বিষয়ে জানতে শাহীনের যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করে অফলাইন পাওয়া যায়। তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তার বড়ভাই ও ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌরসভার মেয়র সহিদুজ্জামান ওরফে সেলিম বলেন, ‘ভাইয়ের সঙ্গে তার খুব বেশি যোগাযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলেও ভাই বেশির ভাগ সময় দেশেই থাকত। দেশেও অনেক ব্যবসা করত।’ সোনা চোরাচালানের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

পশ্চিমবঙ্গের সিআইডি ও ঢাকার ডিবি পুলিশের সূত্র বলছে, সংসদ সদস্য আনোয়ারুলের কলকাতার সোনা ব্যবসায়ী বন্ধু গোপাল বিশ্বাস প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এবং ঢাকায় গ্রেফতার তিনজন এমন তথ্য দিয়েছেন। তবে এখনো এ সবই প্রাথমিক তথ্য। তদন্তে আরও অনেক কিছু জানা যাবে।

ডিবি এই হত্যার কারণ নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মহাপরিদর্শক (সিআইডি) অখিলেশ চতুর্বেদী কলকাতার গণমাধ্যমকে বলেন, সঞ্জীবা গার্ডেনসের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে সংসদ সদস্যকে হত্যার নেপথ্যে রয়েছে সোনা চোরাকারবার নিয়ে বিরোধ।

দুই দেশের পুলিশ সূত্র বলছে, ২০০ কোটি টাকার সোনা মেরে দেওয়া নিয়ে শুরু হওয়া এই দ্বন্দ্ব থেকেই আনোয়ারুলকে খুন করে সোনা চোরাচালানের পথ পরিষ্কার করতে চেয়েছিলেন শাহীন। তবে এর কোনো প্রমাণ রাখতে চাননি। তাই হত্যার জন্য ৫ কোটি টাকার চুক্তি করেন ইতোমধ্যে ঢাকায় গ্রেপ্তার আমানউল্লাহর (চরমপন্থী নেতা শিমুল ভুঁইয়া) সঙ্গে। আমানউল্লাহর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি দলকে বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। হত্যার জন্য বিকল্প হিসেবে কলকাতায়ও একটি দলকে ভাড়া করা হয়। হত্যার পর মরদেহ টুকরা টুকরা করে গুম করতে কলকাতায় আরেকটি দলকে ভাড়া করেন শাহীন। আমানউল্লাহ পুলিশকে জানিয়েছেন, কিলিং মিশনের কোনো দলই অন্য দলের কাউকে চিনত না। সবার ভিন্ন ভিন্ন কাজ নির্ধারণ করেছিলেন শাহীন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কলকাতার গোপাল বিশ্বাসও মাঝেমধ্যে পাচার হওয়া সোনা কিনতেন। তবে তাঁর টাকা কম থাকায় বেশির ভাগ সময় তিনি পাচারের সোনা কেনাবেচায় মধ্যস্থতা করতেন। প্রাথমিকভাবে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গোপালের সংশ্লিষ্টতা না পেলেও তাঁকে কলকাতা থেকে বাইরে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি।

খুনের পরিকল্পনা গুলশান-ধানমন্ডিতে
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার মাধ্যমে আনোয়ারুল আজীমকে হত্যা করা হয়েছে। খুনিরা অনেক দিন ধরে সুযোগ খুঁজছিল। তিনি বলেন, ঢাকার গুলশান ও ধানমন্ডির দুটি বাসায় এক-দুই মাস ধরে এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ঢাকায় ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকায় হত্যার স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কলকাতাকে।
পুলিশের দাবি, খুনের পর হত্যাকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে।

মরদেহের টুকরাগুলো যেভাবে সরানো হয়
হারুন অর রশীদ বলেন, সংসদ সদস্য আনোয়ারুলকে হত্যার পর মরদেহ টুকরা টুকরা করে হলুদ ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে পথে কেউ ধরলে বলতে পারে, বাজার থেকে কেনা। উদ্দেশ্য ছিল, এভাবে গুম করা হবে, যাতে কেউ কোনো দিন তাঁর অস্তিত্ব না পায়। তিনি বলেন, ১৩ মে আমানউল্লাহ, জিহাদ ও সিয়াম দুটি স্যুটকেসে এমপির দেহের টুকরাগুলো ভরে পাবলিক টয়লেটের সামনে দাঁড়ানো একটি গাড়িতে ওঠেন। সেই গাড়ির চালকও তেমন কিছু জানতেন না। পরে সিয়াম ও জিহাদকে স্যুটকেসসহ বিদায় করে আমানউল্লাহ আবার ওই ফ্ল্যাটে চলে যান। পরদিন ওই তিনজন বাকি টুকরাগুলো পলিথিনে পেঁচিয়ে ব্যাগে ভরে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে যান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘দুই দেশের গোয়েন্দারা একমত হতে পারলে আমাদের একটি টিমও সেখানে (ভারত) যাবে।’

আট দিনের রিমান্ডে ৩ আসামি
সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেফতার তিন আসামির আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রিমান্ডপ্রাপ্তরা হলেন, তানভীর, শিমুল ভূঁইয়া ও সেলেস্তি রহমান।

শুক্রবার (২৪ মে) দুপুর সোয়া ২টার দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাদের হাজির করা হয়। এ সময় মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাদের ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিলরুবা আফরোজ তিথি এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার সৈয়দ আমানুল্লাহ, ফয়সাল আলী ও সেলেস্তি রহমানকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

‘বাবার লাশের এক টুকরো মাংস চাই, জানাজা করাতে চাই’
‘আমার বাবার লাশের এক টুকরো মাংস চাই। যে মাংসের টুকরো ছুঁয়ে দেখতে পারি। সে মাংসের টুকরোকেই বাবা মনে করে জানাজা করাতে চাই।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেছেন চিকিৎসার জন্য ভারতের কলকাতায় গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হওয়া ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারের কন্যা মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন।
শুক্রবার ‘এমপি আজিমকে হত্যার সুষ্ঠু বিচার ও হত্যার পরিকল্পনাকারীকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির’ দাবিতে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। সেখানেই কাঁদতে কাঁদতে বাবার হত্যার বিচার চেয়ে এসব কথা বলেন ডরিন।
বিকাল ৫টার দিকে কালীগঞ্জ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা শহরের মেইন বাসস্ট্যান্ডে এ কর্মসূচির আয়োজন করেন।

ডরিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাবা হারানোর ব্যথা-কষ্ট বোঝেন। তিনি আমার বাবা হারানোর বেদনা বুঝবেন। তার বাবার হত্যার বিচার করেছেন, আমার বাবা হত্যার বিচারও করবেন। হত্যার পরিকল্পনাকারীকে ধরার পরই খতিয়ে দেখা যাবে আসলে সে এত বড় অপকর্ম কেন ঘটাল। এর বিচার অবশ্যই হবে।

এদিকে ঢাকা থেকে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে বাসায় ফেরেন আনারকন্যা মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। শুক্রবার দুপুরে শহরের ভূষণ স্কুল সড়কে নিজ বাসভবনের নিচে স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব হোসেন খান, সহ-সভাপতি শামীম আরা মান্নান, কালীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলমসহ অন্যরা।

এমপি আনারকন্যা বলেন, প্রধানমন্ত্রী নিজে আমাকে ফোন দিয়েছেন। তিনি আমাকে ধৈর্য ধরতে বলেছেন। তিনি বলছেন আমি তোমার সঙ্গে আছি। তুমি আমাকে বলেছ তোমার বাবাকে খুঁজে দিতে, আমি ইন্ডিয়ান পুলিশকে দিয়ে তোমার বাবাকে খুঁজে দিয়েছি। আর কী চাও আমাকে বলো। এখন পুলিশ তদন্ত করবে রিপোর্ট আসলে আমি ব্যবস্থা নেব। আর কিছু করতে হলে আমাকে জানাও। আমি তখন বলেছি, না আপা আপনি যা ভালো মনে করেন করবেন। আপনি বিচক্ষণ, আপনিই এর বিচার করবেন।

ড্রোনের মাধ্যমে খোঁজা হচ্ছে এমপি আজিমের দেহাংশ
এমপি আনোয়ারুল আজিম আনারের দেহাংশ খুঁজতে এবার ড্রোন নামানো হয়েছে। সেইসঙ্গে ভাঙড়ের কৃষ্ণমাটি এলাকার খালে তল্লাশি চালাচ্ছে বিপর্যয় মোকাবিলা দল। তবে এখনও কিছুই পাওয়া যায়নি। এদিকে যতো সময় পার হচ্ছে ততোই অভিযুক্ত জিহাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করে রোমহর্ষক ঘটনার কথা জানতে পারছেন সিআইডির কর্মকর্তারা।
জিজ্ঞাসাবাদে সিআইডিকে জাহিদ জানিয়েছে, সিয়ামকে সাথে নিয়ে ভাড়া গাড়ি করে এমপি আনোয়ারুলের দেহাংশ নিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী হাইওয়ে ধরে ভাঙড়ের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। বাংলাদেশের এমপির দেহাংশ বিভিন্ন প্রান্তে ফেলে দেওয়া হয়।

জিহাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসন্তী হাইওয়ের আশপাশে তল্লাশি অভিযান এদিন বিকাল পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছে তদন্তকারীরা। ইতোমধ্যে বারাসত আদালত থেকে জিহাদকে ১২ দিনের হেফাজতে নিয়েছে সিআইডি। চলছে ম্যারাথন জেরা।

সিআইডি সূত্রে জানা গেছ, ক্রমশ জেরার মুখে ভেঙ্গে পড়ছে জিহাদ। সে জানিয়েছে, এমপি আজিম খুনের পর নিউটাউনের অভিজাত আবাসনের ফ্ল্যাটে হাজির ছিলো এই খুনে মূল অভিযুক্ত আমানুল্লাহ। তাকে সুপারি দিয়েছিল মাস্টারমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহিন। ফ্ল্যাটেই ছিল আখতারুজ্জামানের বান্ধবী শিলাস্তা রহমান ও আরও দুই অভিযুক্ত মুস্তাফিজুর ও ফয়জল। ফ্রিজের ভিতর রাখা ছিল দেহাংশ। আর পাশের ঘরে বসে সারারাত ধরে চলে মদ্যপান ও খাওয়া দাওয়া। এরপর দেহাংশ ভর্তি দুটি ট্রলি ব্যাগ নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে অভিযুক্ত সিয়াম ও জাহিদ। তারা দুজন এমপির দেহ টুকরো টুকরো করে কাটে। দেহের মাংস ও হাড় আলাদা করে ছাড়িয়ে নেয়। যাতে তাড়াতাড়ি না পচে তাই দেহাংশে হলুদ মাখানো হয়। মাংস টুকরো করে ফেলে। গুঁড়িয়ে ফেলা হয় হাড়।
সিআইডিকে জিহাদ জানায়, সিয়ামকে সাথে নিয়ে ভাড়া গাড়ি করে বেরিয়ে যায় এমপির দেহাংশ ফেলতে।

কসাই জিহাদ ছিলেন শাহীনের ভাড়া করা আরও একটি ফ্ল্যাটে
২০১৮ সালে চিনার পার্কের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন আখতারুজ্জামান শাহীন। তারপর থেকে বার কয়েক ওই ফ্ল্যাটে আসা-যাওয়া করেছেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কসাই জিহাদ হাওলাদারও এই ফ্ল্যাটে ছিলেন বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার অনলাইন।

আনন্দবাজার জানায়, আনোয়ারুলকে খুনের ঘটনায় বৃহস্পতিবার বনগাঁ থেকে গ্রেফতার করা হয় জিহাদকে। পেশায় কসাই জিহাদকে মুম্বাই থেকে কলকাতায় আনা হয়। মাস দুয়েক আগে কলকাতায় আসেন তিনি। তারপর তাকে চিনার পার্কের ফ্লাটে রাখা হয়। ওই ফ্লাটের প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, আখতারুজ্জামানকে গত দুমাসে কয়েকবার ফ্লাটে আসতে দেখেছেন তারা।

ওই ভবন কমিটির সদস্য কিঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, দিন ১০ আগেও ওই ফ্লাটে কেউ ছিল বলে এখন আবাসনের অনেকেই বলছেন। তবে কারা ছিলেন, তা নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারছেন না। এই ভাড়া ফ্লাটের কাগজপত্রে (এগ্রিমেন্ট পেপার) যারা সই করেছিলেন তাদের সকলের সঙ্গেই আনন্দবাজার অনলাইন যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সকলের ফোন বন্ধ থাকায় তা সম্ভব হয়নি।

চিনার পার্কের ফ্লাটের কাগজপত্রে দু’জন সাক্ষীর কথা আছে। তাদের মধ্যে একজনের নাম পিন্টু দাস। তিনি আখতারুজ্জামানের গাড়ির চালক। ফ্ল্যাটের গ্যারেজে পার্ক করা আখতারুজ্জামানের ইনোভা গাড়ি চালাতেন পিন্টু। আখতারুজ্জামানকে ওই ফ্ল্যাটে নিয়ে আসতেন তিনি। তা ছাড়াও কয়েকবার ফ্লাটে এসেছেন পিন্টু। কেন তিনি ফ্লাটে এসেছেন, তা নিয়ে রহস্য আছে। ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। পাশাপাশি, ওই ফ্লাটের পরিচারিকার সঙ্গেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তার ফোনও বন্ধ।

সিআইডি জানায়, বৃহস্পতিবার গ্রেফতার করার পর জিহাদকে ভাঙড়ের একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আজিমকে খুনের পর সেখানেই দেহাংশ ফেলা হয়েছে বলে জেরায় উঠে এসেছে। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেখান থেকে কোনও দেহাংশই মেলেনি। শুক্রবার আবার তাঁকে নিয়ে সেই জায়গায় যাওয়া হয়েছে।

ফ্রিজে ছিল দেহ, সারারাত উল্লাস করেছে হত্যাকারীরা
নিউটাউনের অভিজাত আবাসনের ফ্ল্যাটে তখন উপস্থিত বাংলাদেশের সংসদ আনোয়য়ারুল আজিম আনার খুনে মূল অভিযুক্ত আমানুল্লাহ। তাকে সুপারি দিয়েছিল মাস্টারমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহিন। ফ্ল্যাটেই ছিল আখতারুজ্জামানের বান্ধবী শিলাস্তা রহমান ও আরও দুই অভিযুক্ত মুস্তাফিজুর ও ফয়জল। ফ্রিজের ভিতর রাখা ছিল দেহাংশ। তাতেও কিছু যায় আসেনি অভিযুক্তদের। পাশের ঘরে বসে সারারাত ধরে চলে মদ্যপান ও খাওয়াদাওয়া। তদন্তে নেমে এমনই বিস্ফোরক তথ্য পেয়েছে কলকাতার সিআইডি। খবর সংবাদ প্রতিদিনের।

ভারতের সিআইডির বরাত দিয়ে সংবাদ প্রতিদিন জানায়, খুনের পর দেহাংশ ভর্তি দুটি ট্রলি ব্যাগ নিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বের হয় অভিযুক্ত সিয়াম ও জিহাদ। পেশায় কসাই জিহাদ। মাস্টারমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহীনের নির্দেশেই দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে গুম করার ব্যবস্থা করে বলে জানিয়েছে জিহাদ। তারা দুজন সাংসদের দেহ টুকরো টুকরো করে কাটে। দেহের মাংস ও হাড় আলাদা করে ছাড়িয়ে নেয়। যাতে তাড়াতাড়ি না পচে তাই দেহাংশে হলুদ মাখানো হয়। মাংস টুকরো করে ফেলে। গুঁড়িয়ে ফেলা হয় হাড়। সিআইডিকে জাহিদ জানায়, সে ও সিয়াম ভাড়া গাড়ি করে বাসন্তী হাইওয়ে ধরে ভাঙড়ের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। বাংলাদেশের এমপির দেহাংশ বিভিন্ন প্রান্তে ফেলে দেওয়া হয়।

জিহাদকে আদালতে তোলা হলে ১২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে কলকাতা আদালত। নেওয়া হয়েছে সিআইডির হেফাজতে। সিয়াম সন্দেহে বনগাঁ সীমান্ত থেকে একজনকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা। জিহাদের দাবি অনুযায়ী, বাসন্তী হাইওয়ের আশপাশে তল্লাশি চালিয়েছে সিআইডি। তবে দেহাংশ পাওয়া যায়নি। ভাঙড়ের কৃষ্ণমাটি এলাকার খালে তল্লাশি চালাচ্ছে বিপর্যয় মোকাবিলা দল। দেহ খুঁজতে কাজে লাগানো হচ্ছে ড্রোন। তবে এখনও কিছুই পাওয়া যায়নি।