দুর্নীতি ও অসৎ রাজনীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ‘হ্যাঁ’ রায় প্রয়োজন: জামায়াতের আমির
দুর্নীতিমুক্ত, শোষণহীন ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘হ্যাঁ মানেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা। দুর্নীতি ও অসৎ রাজনীতি থেকে মুক্ত একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তেই এই রায় প্রয়োজন।’
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে দুপুরে তিনি গোদাগাড়ী উপজেলার মহিশালবাড়ি ডিগ্রি কলেজ মাঠে জনসভায় বক্তব্য দেন।
রাষ্ট্র পরিচালনায় জামায়াতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মূল সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। ক্ষমতায় যেতে পারলে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রধান লক্ষ্য হবে দুর্নীতির মূলোৎপাটন। পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির আর কোনো স্থান থাকবে না; রাজনীতি চলবে মেধা, যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে। বিগত সময়ের অত্যাচার, লুটতরাজ ও অপরাজনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হবে।’
নির্বাচন ও গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ভোটের দিন জনগণকে দুটি ভোট দিতে হবেÑএকটি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এবং অপরটি ‘হ্যাঁ’Ñতে। দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার মধ্য দিয়েই নতুন বাংলাদেশের পথ সুগম হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।”
শিক্ষা বিষয়ে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে জামায়াত আমির বলেন, ‘দল দায়িত্ব পেলে দেশের প্রতিটি শিশুর শিক্ষার ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করবে। প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। তাঁর মতে, শিক্ষিত ও নৈতিক মানুষই দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের মূল শক্তি।’
তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা বেকার ভাতা চায়নি, তারা চেয়েছে কাজের অধিকার।’ সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলে তাদের হাতে সম্মানজনক কর্মসংস্থান তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য নয়, যোগ্যতা ও দেশপ্রেমই হবে একমাত্র মাপকাঠি। একই সঙ্গে সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নারী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেন। ভোটাধিকারসহ সব গণতান্ত্রিক অধিকার পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা হবে বলেও জানান তিনি।’
পর্যটন খাতের প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে দেশের পর্যটন শিল্প আজ সংকটের মুখে। রাজশাহীর প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা গেলে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
জামায়াত আমির বলেন, ‘রাজশাহীর কিছু সমস্যা আছেÑথাকবে, সব জায়গায় সমস্যা আছে; যেহেতু ইনসাফ কায়েম নাই; যেহেতু দেশকে নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের কমিটমেন্ট নাই। এখানে একটা মেডিকেল কলেজ আছে, বহু পুরনো। তার সাথে একটা ডেন্টাল ইউনিট করা হয়েছে, ডেন্টাল কলেজ করা দরকার। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটা ঘুমিয়ে পড়েছে। আর কয়টা দিন তো, সবুর করুন। যদি আপনাদের পছন্দের লোকদেরকে দায়িত্ব দেন, আপনাদের কিছু করতে হবে না। আমরাই খুঁজে খুঁজে সব বের করব, জাতিকে সেবা দেওয়ার জন্য। আপনাদের ডেন্টাল কলেজকে আমরা টান দিয়ে জাগিয়ে তুলে দেব।’
তিনি বলেন, ‘সুগার মিল লোকসানি। কেন লোকসানি হবে? আমার দেশের মাটিতে আখ ফলে। আমার দেশের শ্রমিকরা কাজ করে। তাহলে লোকসানি কেন? চুরি চামারির কারণে লোকসানি। যদি আপনাদের রায়ের প্রতিফলন ঘটে; ১৩ তারিখ থেকে বলা লাগবে না অটোমেটিক্যালি অনেকের কান এবং নাক খুলে যাবে। বাংলাদেশ নতুন পথ পাবে ইনশাআল্লাহ।’
রাজশাহীতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বলা হয়েছে এখানে সিএনজির সরবরাহ নিশ্চিত করা। হ্যাঁ, সমুদ্রে এখনও আমরা আমাদের সম্পদ আহরণে ঢুকতে পারিনি। আল্লাহ আমাদেরকে যদি তৌফিক দেন, কারও চোখ রাঙানির পরোয়ানা করব না, ইনশাআল্লাহ। দেশের সম্পদ দেশের মানুষের জন্য তুলে আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।’
এই জনসভা থেকে ডা. শফিকুর রহমান রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। জামায়াতে ইসলামী রাজশাহী মহানগরের আমির ড. মো. কেরামত আলীর সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তব্য দেন- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নায়েবে আমির অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান, রাজশাহী-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু, ঢাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামসহ জামায়াত-শিবির ও ১১ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ।
এর আগে গোদাগাড়ীর জনসভায় জামায়াতে ইসলামির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা নিজেরা দুর্নীতি করব না এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয়ও দেব না। সকলের জন্য ন্যয় বিচার হবে, এখানে কেউ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। জুলাই সনদ এবং সংস্কারের সমস্ত প্রস্তাব মেনে নিয়ে তা বাস্তবায়নের ওয়াদা করতে হবে। এই তিন শর্তে যারা একমত হয়েছে তারা আমরা ১১ দলে একত্রিত হয়েছি। আমাদের ১১ দলে কোনো প্রার্থীর মাঝে কোনো ব্যাংক ডাকাত নাই। চাঁদাবাজ, ঋণখেলাপি, মামলাবাজ, নারী নির্যাতনকারী, মানুষের অধিকার হরণকারী নাই। আমরা বেছে বেছে গুণে গুণে চেষ্টা করেছি। আমরা আগামীতে একটা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।
জামায়াতের আমির বলেন, আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি জাতির বাক পরিবর্তন এবং জাতিকে সঠিক পথে উঠানোর নির্বাচন। বহু রক্তের বিনিময়ে আমরা এই নির্বাচন পেয়েছি। যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে চব্বিশ এনে দিয়েছিল আমাদেরকে, তাদের অনেকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাই আমরা ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েছি। আমরা সমাজের সর্বক্ষেত্রে ন্যায় বিচার চাই। এই বাংলাদেশ হবে নতুন বাংলাদেশ।
তিনি আরও বলেন, আমরা সে বাংলাদেশ চাই যে বাংলাদেশে শিশু, বৃদ্ধ, আবাল বনিতা সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। যে বাংলাদেশে আমার মায়েরা ঘরে, চলাচলে, কর্মস্থলে নিরাপদ থাকবে, সমাজ তাদের মর্যাদা দেবে সেই বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাচ্ছি। আমরা সেই শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেই শিক্ষাব্যবস্থা লড়াকু একজন সৈনিক তৈরি করবে যে দেশটাকে গড়ে দেবে। আমাদের যুবকেরা কারও কাছে বেকার ভাতা চায় না। আমরা ওয়াদাবদ্ধ। আমরা গ্রামীণ অর্থনীতিকে পাল্টে দেব।
অপরাধ করলে সবার সমান সাজা হবে, এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, এমন বিচারব্যবস্থা আমরা চাই, যে বিচারে একজন সাধারণ মানুষের কোনো অপরাধ করলে যে শাস্তি হবে; দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি যদি একই অপরাধ করে; বিচার তাকে ছাড় দিয়ে কথা বলবে না। একই শাস্তির আওতায় তাকে আনা হবে। আনতে বাধ্য করা হবে।
ন্যয়বিচার যখন প্রতিষ্ঠিত হবে, জনগণ সকল ক্ষেত্রে তাদের অধিকার পেয়ে যাবে। এই বাংলাদেশে কোনো অভদ্র, কোনো দুষ্টু, কোনো বেয়াদব আমার মায়েদের দিকে বাঁকা চোখে তাকানোর সাহস পাবে না। ওই বাংলাদেশ যেখানে ধর্মবণ, জাত-পাতে ভেদাভেদ করে বাংলাদেশটাকে আর টুকরো টুকরো করতে দেব না। এই বাংলাদেশ হবে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ।
এই জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের আমির আব্দুল খালেক। এতে গোদাগাড়ী-তানোরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।