খামেনিকে হত্যার পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলাবে? সন্দিহান মার্কিন কর্মকর্তারা
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পরও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান নিকট ভবিষ্যতে সেখানে শাসনব্যবস্থা বদলাতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সন্দিহান অনেক মার্কিন কর্মকর্তা।
হামলার আগে-পারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পসহ দেশটির অনেক কর্মকর্তাই ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে পঙ্গু করে দেওয়ার পাশাপাশি দেশটির নিপীড়নপ্রবণ শাসনব্যবস্থা উৎখাতও তাদের অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছিলেন।
“সব ইরানি দেশপ্রেমিক, যারা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় ছিলেন তাদের এই সুযোগ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি, আপনার দেশ পুনর্দখল করুন,” ট্রুথ সোশালে দেওয়া ভিডিওতে রোববারও ট্রাম্প এ কথা বলেছেন।
কিন্তু এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইরানের বহুধাবিভক্ত বিরোধীরা ১৯৭৯ সাল থেকে চলে আসা ধর্মকেন্দ্রিক, কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা উৎখাতে আদৌ সক্ষম কিনা তা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সম্বন্ধে অবগত তিন মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন।
তবে কর্মকর্তাদের কেউই ইরানে শাসনব্যবস্থার পতনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান বিমান হামলায় খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশকে হারানো ইরানি শাসকরা এখন ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে, জানুয়ারিতে সহিংস উপায়ে বিক্ষোভ দমনের কারণে ইরানের ভেতরেও একাংশের কাছে তারা তুমুল অজনপ্রিয়।
কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনই কিংবা নিকট ভবিষ্যতে দেশটিতে শাসনব্যবস্থার বদল দেখার সম্ভাবনা খুব কম, বলছেন তারা।
খামেনিকে হত্যা করা হলে তার স্থলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) কোনো কট্টরপন্থি নেতা কিংবা কট্টরপন্থি কোনো আলেমই বসতে পারেন—ইরানে হামলার আগেই মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ তাদের মূল্যায়নে এ আভাস দিয়েছিল বলে দুই সূত্রের বরাত দিয়ে আগেই এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল রয়টার্স।
হোয়াইট হাউসের ভেতরকার আলোচনা সম্বন্ধে অবগত এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, আইআরজিসির কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ বা পক্ষ বদলের সম্ভাবনা কম। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, তারা শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য টিকিয়ে রাখতে বানানো বিস্তৃত এক নেটওয়ার্কের সরাসরি সুবিধাভোগী।
সিআইয়ের ওই মূল্যায়নের আগে আরেক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে আসা অন্তত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে হওয়া বিশাল সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং তা থামাতে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনপীড়নের মধ্যেও আইআরজিসির কেউ পক্ষত্যাগ করেনি।
কোনো সফল বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের জন্য এ ধরনের পক্ষত্যাগ খুবই জরুরি শর্ত, বলেছে আরও তিনটি সূত্র। পৃথক ওই গোয়েন্দা সংস্থাটির নাম প্রকাশ না করতে সূত্রগুলো রয়টার্সকে অনুরোধ করেছে।
গোয়েন্দা মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা হওয়ায় রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা সব সূত্রই নিজেদের নাম-পরিচয় গোপন রাখতে বলেছে।
এদিকে ট্রাম্প নিজেই রোববার বলেছেন, তিনি ফের ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করতে চান। ওয়াশিংটন যে ইরানে সহসা সরকার পতন দেখছে না, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ বক্তব্যে তার খানিকটা আভাস আছে।
এসব প্রসঙ্গে মন্তব্য চেয়ে রয়টার্স অনুরোধ করলেও হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে তাতে সাড়া দেয়নি। সিআইএ কিছু বলতে রাজি হয়নি।
তুমুল তর্ক-বিতর্ক, মতভেদ
রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজিশকিয়ান জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালনে সাময়িক সময়ের জন্য একটি নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করেছে ইরান। ওই পরিষদে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বিচার বিভাগের প্রধান ও ইরানের খুবই প্রভাবশালী গার্ডিয়ান কাউন্সিলের এক সদস্য আছেন।
এদিকে দেশটির নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি অভিযোগ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে চায়। তিনি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে’ হুঁশিয়ার করে বলেছেন, তারা কোনো পদক্ষেপ নিলে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
ইরানে মেয়েদের একটি প্রাথমিক স্কুলসহ দেশটিতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মুহুর্মুহু বিমান হামলার পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন রোববার লারিজানির এ হুঁশিয়ারি প্রচার করে। মেয়েদের স্কুলে ওই হামলায় ১৮০ জনের বেশি বেসামরিকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
খামেনিকে হত্যা করা হলে নতুন নেতা কে হবে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আলোচনা কেবল এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে মেরে ফেললে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে কিনা, তা নিয়ে জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের মধ্যে তুমুল তর্ক বিতর্কও হয়েছে; শেষ পর্যন্ত তারা এ প্রসঙ্গে ঐকমত্যেও পৌঁছাতে পারেননি বলে জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা।
খামেনির মৃত্যু বা ক্ষমতাচ্যুতি ইরানকে তার ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক স্থাপনা ও সক্ষমতা পুনর্গঠন থেকে সর্বোচ্চ কতখানি দূরে সরাতে পারবে, তা নিয়েও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে বলে ওই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জানুয়ারিতে ইরানজুড়ে তুমুল বিক্ষোভের পর ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ একাধিকবার নির্বাসিত রেজা পাহলভির সঙ্গে কথা বলেন; এর প্রেক্ষিতে তেহরানে সরকার পড়লে ইরানের সর্বশেষ এ শাহের ছেলেকে ক্ষমতায় বসাতে ওয়াশিংটন কতটুকু কী করতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়, বলেছেন দুই কর্মকর্তা।
ওয়াশিংটনের সমর্থনপুষ্ট কোনো সরকারবিরোধী নেতা আদৌ ইরানের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন অনেক মার্কিন কর্মকর্তা এখনও সন্দিহান।
“দিনশেষে, যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শেষ হবে, যদি ইরানি জনগণ বেরিয়ে আসে, শাসনব্যবস্থার ইতি ঘটানোর ক্ষেত্রে তাদের সফলতার অনেকখানি নির্ভর করবে এই শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কতজন তাদের সঙ্গে সংহতি জানাচ্ছে তার ওপর।
“না হলে, শাসকদের অবশিষ্ট অংশ, যাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র থাকবে, তারা ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে ওই অস্ত্র ব্যবহার করবে এমন সম্ভাবনাই বেশি,” বলেছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের সঙ্গে থাকা সাবেক মার্কিন উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন পেনিকফ।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ