ঈশ্বরদীতে ৩দিন ব্যাপী ‘চরনিকেতন বৈশাখী সাহিত উৎসবে’ দুই বাংলার কবি সাহিত্যিকদের মিলনমেলা
সাহিত্য আড্ডা, কবিতা নিয়ে আলোচনা, কবি কন্ঠে কতিা পাঠের আসর, লাঠি খেলা, চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগীতা, মেলা, কবি মজিদ মাহমুদের জন্মোৎসব, সংবর্ধনাসহ বিভিন্ন অয়োজনের মধ্য দিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে তিন দিন ব্যাপী ‘চরনিকেতন বৈশাখী সাহিত্য উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যা দুই বাংলার কবি সাহিত্যিকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) আনুষ্ঠানিকভাবে ঈশ্বরদীর প্রত্যন্ত চরাঞ্চল চরগড়গড়ি গ্রামে ‘চরনিকেতন কাব্যমঞ্চ’ প্রাঙ্গনে আয়োজিত এই সাহিত্য উৎসব শেষ হয়। তিন দিনব্যাপী এই সাহিত্য উৎসবে এবারের অয়োজনে ছিল বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, লাঠি খেলা, চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগীতা, বাউল সংগীত, দেশাত্ববোধক গান, কবিকন্ঠে কবিতাপাঠ, বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সেমিনার, সমাপনি দিনে কবি মজিদ মাহমুদের ৬০তম জন্মদিন উৎযাপন ইত্যাদি।
ঈশ্বরদীর প্রত্যন্ত চরাঞ্চল চরগড়গড়িতে ‘চরনিকেতন বৈশাখী সাহিত্য উৎসব’ মুলত দুই বাংলার কবি সাহিত্যিকদের মিলন মেলায় পরিণত হয়। যেখানে দুই বাংলার শতাধিক সাহিত্যিক, কবি ও আবৃত্তি শিল্পীদের মিলনমেলায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই আয়োজন করা হয় এই উৎসব।
উৎসবে অংশগ্রহণকারী কবি-সাহিত্যিক ও বক্তারা বলেন, বাঙালির সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে লোকগান, কাব্য ও সাহিত্যের চর্চা বাড়াতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি। ধর্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্টের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান বক্তারা।
পহেলা বৈশাখে উদ্বোধনী দিনে অনুষ্ঠানের শুরুতে চরনিকেতন ‘বৌটুবানি পাঠশালা’র শিশু শিল্পীরা দলীয় সংগীত পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করে। পরে আগত কবিরা স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন, যা উৎসবে ভিন্নমাত্রা যোগ করে। আয়োজকরা জানান, ঈশ্বরদীর চরগড়গড়ি গ্রামে গত ২৭ বছর ধরে ‘চরনিকেতন’ বাংলা সাহিত্য গবেষণা ও প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে।
তিন দিন ব্যাপী এই উৎসবে ভারত, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক কবি সাহিত্যিকগণ অংশগ্রহণ করেন। উৎসবের সমাপনি দিন গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় এই উৎসব।
চরনিকেতন সাহিত্য উৎসবের উদ্যোক্তা ও আয়োজক কমিটির সভাপতি কবি মজিদ মাহমুদের সভাপতিত্বে উৎসবের বিভিন্ন পর্বে অতিথি ছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, কবি নাসির আহমেদ, পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার, প্রবীণ সাংবাদিক মাহবুব আলম, শিশু সাহিত্যিক রহীম শাহ্, কবি ও প্রাবন্ধিক সৈকত হাবিব, নজরুল গবেষক আনোয়ারুল হক, কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, ভারতের কবি মলয় চন্দন মুখোপাধ্যায়, মানিক পন্ডিত, গবেষক আব্দুল কাইয়ুম প্রমুখ।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন কামরুজ্জামান প্রিন্স। সমন্বয় করেন ডা. সানোয়ারা প্রপা, মো. মাজহারুল ইসলাম, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. আব্দুল ওয়ারেস, কবি-গীতিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক বিশ্বাস। উৎসবে ‘বাংলা কথাসাহিত্যে বিবর্তনের ধারা’ এবং ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যচিন্তা ও বিশ্বরাজনীতি’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার উৎসবের সমাপনী দিনে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা, কবিতা পাঠ এবং কবি মজিদ মাহমুদের জন্মদিন উৎযাপনের কর্মসূচি পালন করা হয়।
অনুষ্ঠান সফল করতে স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সহযোগিতা করছেন। বিশিষ্ট কবি ও গবেষক মজিদ মাহমুদ এই উৎসবের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রবর্তক। ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি তাঁর নিজ গ্রাম চরগড়গড়িকে শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, চরনিকেতন কমপ্লেক্স ও সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে নিয়মিত আয়োজিত এই উৎসব বর্তমানে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার অন্যতম প্রধান মঞ্চ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।