রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

সংগ্রাম পেরিয়ে নতুন কুঁড়ির মঞ্চে কাবাডিতে সেরা বীনা হেমব্রম

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৯ মে ২০২৬ ০৯:২৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৯ মে ২০২৬ ০৯:২৬ অপরাহ্ন
সংগ্রাম পেরিয়ে নতুন কুঁড়ির মঞ্চে কাবাডিতে সেরা বীনা হেমব্রম

বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কার্যক্রম। সেই উদ্যোগের উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে রাজশাহীর পবা উপজেলার কিশোরী বীনা হেমব্রম। দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতাকে জয় করে জেলা পর্যায়ের কাবাডি প্রতিযোগিতায় সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়ে এখন আলোচনায় সে। 


শনিবার (৯ মে) বিকেলে রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত জেলা পর্যায়ের ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠানে কাবাডি বালিকা আসরে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে“ম্যান অব দ্য ফাইনাল”নির্বাচিত হয় বীনা হেমব্রম। তার এ অর্জনে আনন্দে ভাসছে পরিবার, বিদ্যালয় ও পুরো এলাকা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু এমপি। জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল, বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এরশাদ আলী ঈশা প্রমুখ।


বীনা হেমব্রম পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের হলদে বোনা এলাকার বাসিন্দা। সে স্থানীয় কসবা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা জগেন টুডু একজন শ্রমজীবী মানুষ। অভাব-অনটনের সংসারে প্রতিদিনই সংগ্রাম করে চলতে হয় পরিবারটিকে। অনেক সময় তিন বেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে। সেই বাস্তবতায় খেলাধুলার জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। তবে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে থামতে দেয়নি বীনা। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। বিশেষ করে কাবাডি খেলায় তার ক্ষিপ্রতা, সাহস ও আত্মবিশ্বাস দ্রুত সবার নজর কাড়ে। বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত অনুশীলন করতে করতেই সে স্কুল দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হয়ে ওঠে।


বীনা হেমব্রম বলে,“খেলাধুলা আমার খুব ভালো লাগে। অনেক কষ্ট আছে, কিন্তু আমি হাল ছাড়তে চাই না। আমি আরও ভালো খেলতে চাই এবং একদিন দেশের হয়ে খেলতে চাই।”


এবিষয়ে রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. শফিকুল হক মিলন বলেন,“বীনা হেমব্রম প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলে তৃণমূলের মেয়েরাও জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতা দেখাতে পারে। তার এই অর্জন শুধু পবা উপজেলার নয়, পুরো রাজশাহীর গর্ব। আমরা চাই, এমন প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা যেন আর্থিক অভাব বা সুযোগের অভাবে হারিয়ে না যায়।”


পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইবনুল আবেদীন বলেন,“নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মূল লক্ষ্যই হলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাবান শিশু-কিশোরদের খুঁজে বের করা। বীনার সাফল্য আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার মতো মেধাবী খেলোয়াড়দের উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।”


বীনার বাবা জগেন টুডু আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,“আমরা গরিব মানুষ। মেয়ের জন্য বড় কিছু করতে পারি না। কিন্তু আমার মেয়ে কষ্ট করে খেলাধুলা করে আজ পুরস্কার পেয়েছে, এতে আমি খুব খুশি। সবাই যদি ওকে একটু সহযোগিতা করে, তাহলে আমার মেয়ে আরও ভালো করবে।”


পবা উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব হাফিজুর রহমান বলেন, অনেক সময় খালি পায়ে মাঠে নেমে অনুশীলন করেছে বীনা। ভালো জুতা, পুষ্টিকর খাবার কিংবা উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকলেও নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কখনো হারাতে দেয়নি সে। পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের নানা কাজেও পরিবারকে সহযোগিতা করতে হয় তাকে। তারপরও প্রতিদিন সময় বের করে অনুশীলন চালিয়ে গেছে বীনা।


কসবা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ প্রামাণিক, বীনা অত্যন্ত ভদ্র, পরিশ্রমী ও মেধাবী একজন শিক্ষার্থী। খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনাতেও সে সমান মনোযোগী। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে সবসময় উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।


জেলা পর্যায়ের ফাইনালে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে“ম্যান অব দ্য ফাইনাল” নির্বাচিত হওয়ার পর বীনার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কার গ্রহণের সময় তার হাসিমাখা মুখ যেন দীর্ঘ সংগ্রামের এক নীরব জয়গাথা হয়ে ধরা দেয়। স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীরা মনে করছেন, বীনার মতো তৃণমূলের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া গেলে দেশের ক্রীড়াঙ্গন আরও সমৃদ্ধ হবে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর মতো উদ্যোগ গ্রামবাংলার অসংখ্য স্বপ্নবাজ শিশুর সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।