রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

হুটহাট বাস ধর্মঘট কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৮ মে ২০২৬ ১১:৩৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৮ মে ২০২৬ ১১:৩৭ অপরাহ্ন
হুটহাট বাস ধর্মঘট কেন?

আর মাত্র নয়দিন পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে পবিত্র ইদুল আজহা। এর মধ্যে অনেকে নিজ বাসায় ফিরেও আসছেন। তবে শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দে হুটহাট বাস চলাচল বন্ধের ঘটনায় অতিষ্ট যাত্রীরা। এবার ইদের আগে বাস বন্ধ হওয়ায় দুর্ভোগ সীমা হারিয়েছেন তারা। পান থেকে চুন খসলেই যেন বন্ধ করা বাস চলাচল। এর এতেই যাত্রীদের দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনার যেন অন্ত নেই। 


রাজশাহী এই আন্তজেলা পরিবহন সংকটের নেপথ্যে জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে সোমবার (১৮ মে) ভোর থেকে বন্ধ করা হয়েছে সব রুটের বাস চলাচল। ইদের আগে ভোগান্তি চরমে তুলেছে যাত্রীদের। সারাদিন বাস বন্ধ রাখার পর রাত আবারও শুরু বাস চলাচল।   


গেল সেপ্টেম্বর থেকে চার দফায় বন্ধ হয়েছে বাস চলাচল। সেপ্টেম্বর মাসে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে দুই দফায় বাস চলাচল বন্ধ করা হয়। এছাড়াও গেল এপ্রিল মাসে নাটোরের মালিকদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে দুইদিন বাস চলাচল বন্ধ থাকে। সবশেষ সোমবার (১৮ মে) ভোর থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত প্রায় ১৬ ঘণ্টা বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়। 


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর শিরোইল থেকে দুরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়। প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বাস ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানের। নগরীর ভদ্রা থেকে আন্তজেলা বাস ছাড়া হয়। এখানেও প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০টি বাস ছেড়ে যায়। এছাড়াও নগরীর রেলগেট থেকে নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০০টির বেশি বাস ছেড়ে যায়। রাজশাহী থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯০০টি বাস ছাড়ে। আর বাস বন্ধ হলে যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়ে। 


সাইফুল ইসলাম নামের এক যাত্রী বলেন, কাউন্টারে এসে দেখি বাস বন্ধ। সব রুটের বাস বন্ধ থাকায় ফেরত যেতে হচ্ছে। এটা চরম ভোগান্তির। অথচ আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি।


ইদের ছুটি কাটাতে আগেভাগেই ময়মনসিংহ যাচ্ছেন রাবি শিক্ষার্থী জুবায়ের হোসেন। তিনি বলেন, মেস থেকে একেবারে বের হয়ে এসেছি। এসে দেখি বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাউন্টারও দেখি বন্ধ। ময়মনসিংহ যাওয়ার জন্য বাস ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। এখন বাধ্য হয়ে আবার ফিরে যেতে হচ্ছে। 


গার্মেন্টস ব্যবসায়ী রাহাত হোসেন বলেন, সোমবার ঢাকায় যাওয়ার কথা দোকানের পণ্য কেনার জন্য। কোরবানি ইদ আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। যদিও এই ইদে বেচাকেনা শেষ দিকে জমে উঠে। কিন্তু শুনি বাস বন্ধ। এতে আমার ব্যবসারও ক্ষতি হয়েছে।    


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বাস কোম্পানীর ব্যবস্থাপক বলেন, শ্রমিকরা হুটহাট ধর্মঘট ডেকে বসেন। এতে মালিকদের বড় অংকের ক্ষতি হয়। কারণ বাস চললে লাভের দেখা মিলে। এছাড়া ঋণ আছে। আমাদের কোম্পানির প্রতিদিন ৩৫টি বাস ছাড়া হয়। এর মধ্যে এসি ননএসি দুই বাসই চলে। আমাদের বাসেই প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মানুষ রাজশাহী-ঢাকা যাওয়া আসা করেন। 


দেশ ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারি বজলুর রহমান রতন বলেন, আমাদের সব মালিকদের গাড়ি ঋণে নেওয়া। প্রতিদিন গাড়ি চলাচল করেই এই ঋণ শোধ করতে হয়। আমরাও শ্রমিকদের এই কর্মবিরতিতে বিড়ম্বনায় পড়ছি। তাদের বুঝিয়েও কাজ হচ্ছে না। এর পেছনে বড় কোন সিন্ডিকেট কাজ করছে। কারণ এরা কথায় কথায় বাস বন্ধ করে দিচ্ছে।       


এর আগে সোমবার (১৮ মে) সকাল থেকে বাস চলাচল বন্ধ হয়েছে। এরপর থেকে কোনো রুটেই আর বাস চলাচল করতে দেখা যায়নি। হঠাৎ বাস চলাচল বন্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা পড়েন চরম ভোগান্তিতে। নির্বাচন ছাড়া রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের কমিটি ঘোষণা করার প্রতিবাদে এই কর্মবিরতি করা হয়। এতে সভাপতি ঘোষণা করা হয় রফিকুল ইসলাম পাখিকে ও মোমিনুল ইসলাম মোমিনকে সাধারণ সম্পাদক করে ২১ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। রোববার এই কমিটি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। এই কমিটি বাতিলের দাবি জানায় শ্রমিকদের একটি অংশ। তারা নির্বাচনের মাধ্যমে এই কমিটি চান।     


এদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে শিরোইলে এসে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ঘোষিত কমিটি বাতিল করেন। এবং ইদের পরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে জানালে শ্রমিকরা ধর্মঘট তুলে নেন। 


জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুপুরে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করি। শ্রমিকদের একটি পক্ষ নির্বাচন চাচ্ছিলেন। তাই তাদের দাবি মেনে নিয়ে ঘোষিত কমিটি স্থগিত করা হয়েছে। ইদের পর তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন করা হবে। এতে শ্রমিকরা এক মত হয়েছেন। এরপর থেকে বাস চলাচল শুরু হয়েছে। তবে ইদের আগে ও পরে যাত্রীদের কোন ভোগান্তি না হয় সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।