চাঁপাইনবাবগঞ্জে মেলায় ১৮৩ জাতের আম, দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়
আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী আম মেলা। জেলার ঐতিহ্যবাহী ও বিলুপ্তপ্রায়সহ ১৮৩ জাতের আমের প্রদর্শনী ঘিরে দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। মেলার প্রথম দিন বিকেল থেকেই জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। বাহারি রং, আকার ও স্বাদের বিরল সব আম এক নজর দেখতে ভিড় করেন শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ দর্শনার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী এই আম মেলার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী। উদ্বোধনের আগে তিনি অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন এবং প্রদর্শিত আমের বিভিন্ন জাত সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
মেলায় সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে ‘আমের জাত প্রদর্শনী’ স্টল। সেখানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন বাগান থেকে সংগ্রহ করা ১৮৩ জাতের আম প্রদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিচিত জাতের পাশাপাশি বহু বিলুপ্তপ্রায় ও দুর্লভ জাতের আম।
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া উল্লেখযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে মোহনবাঁশী, জিলাপি ফ্যাড়া, তোতাপুরি, জাদুজেম, শরবতি, আরিয়া, তুজাহারি, ঊষাপন্নি, কেইট, কিউজাই, দিলসাদ, ছাব্বিশ হাজারী গুটি, চাষা বুলি, ব্রুনাই কিং, আরা জনি, ঊ২জ২, ময়না, ডকমাই, জামাই মুশি, হানিডিউ, মাল্ডি, চ্যাংগাই, বারি-১১, কিং অব চাকাপাত, ইলামতি, আপেল ম্যাংগো, বানানা, রেড পলমার, চাকাপাত, স্প্যামি, রেড আইভরি, সুরমা গুটি, অস্টিন, রূপা গুটি, মান্নান গুটি, আলফাংস, দুধসর, সুইট কাটিমন, শালদা গুটি ও ঝিকুড়ি গুটি।
আয়োজকরা জানান, প্রদর্শিত প্রতিটি আমের স্বাদ, রঙ, গন্ধ ও আকার আলাদা। এসব জাতের অনেকগুলোই একসময় জেলার বিভিন্ন বাগানে দেখা গেলেও বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এসব ঐতিহ্যবাহী জাতের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতেই এই আয়োজন।
মেলার প্রথম দিনেই দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কলেক্টরেট উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী একেএম ইমতিয়াজ বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এত ধরনের আম উৎপাদন হয়, তা আগে জানতাম না। মেলায় এসে অনেক নতুন জাতের আম দেখলাম। এসব জাত সংরক্ষণ করা উচিত।
একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাফির বিন তৌফিক ইমাম বলেন, এত জাতের আম একসঙ্গে দেখে আমরা মুগ্ধ। আম মেলার সৌন্দর্যই যেন বেড়ে গেছে এই প্রদর্শনীর কারণে।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, বড়রাও আগ্রহ নিয়ে প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন। শহরের আরামবাগ এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ হয়েও কখনো এত জাতের আম একসঙ্গে দেখিনি। এত ধরনের আম যে আমাদের জেলায় রয়েছে, সেটাই জানা ছিল না। এগুলো আমাদের ঐতিহ্য ও সম্পদ। সব জাত সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. ইয়াছিন আলী বলেন, মেলায় প্রদর্শিত ১৮৩ জাতের আম জেলার বিভিন্ন এলাকার বাগান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু বিদেশি জাত থাকলেও বেশিরভাগই দেশীয়। মানুষের মধ্যে আম সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ানো, বিলুপ্তপ্রায় জাতগুলোকে পরিচিত করা এবং সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিত। এ ধরনের আয়োজন জেলার আমের ব্র্যান্ডিং, বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বিলুপ্তপ্রায় জাত সংরক্ষণেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
মেলায় জেলার বিভিন্ন কৃষক, নার্সারি মালিক, উদ্যোক্তা ও কৃষি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্টলও স্থান পেয়েছে। দর্শনার্থীরা আমের বিভিন্ন জাত সম্পর্কে তথ্য জানার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।
আয়োজকদের আশা, তিন দিনব্যাপী এই মেলা শুধু দর্শনার্থীদের আনন্দই দেবে না, বরং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আমের বৈচিত্র্য তুলে ধরে দেশি-বিদেশি বাজারে জেলার আমের ব্র্যান্ডিং ও বাণিজ্য সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।