শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

আমাজ়নের জঙ্গলে খোঁজ মিলল বিলুপ্ত এক সভ্যতার! ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস!

সোনার দেশ ডেস্ক ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫১ পূর্বাহ্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সোনার দেশ ডেস্ক ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১১:৫১ পূর্বাহ্ন
আমাজ়নের জঙ্গলে খোঁজ মিলল বিলুপ্ত এক সভ্যতার! ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস!
আমাজ়ন নদী অববাহিকা। ছবি: আইস্টক।

ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা তখনও পৌঁছোননি দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা। আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। সেই সময়েও আমাজ়নের জঙ্গলে গড়ে উঠেছিল এক উন্নত সভ্যতা। ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তেমনটাই উঠে এসেছে।


প্রাক-কলম্বীয় যুগে আমাজ়নের অরণ্য কেমন ছিল, তা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ভ্রান্ত ধারণা ছিল বিশেষজ্ঞদের। ১৪৯৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছোন ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস। তারও বছর ছয়েক আগে, ১৪৯২ সালে তিনি ‘আবিষ্কার’ করেন আমেরিকা। কলম্বাস আমেরিকা খুঁজে পাওয়ার আগের সময়কালকে বলা হয় প্রাক-কলম্বীয় যুগ।


দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অনুমান করা হত, প্রাক-কলম্বীয় যুগে আমাজ়ন অরণ্যে কোনও সমৃদ্ধ সভ্যতা ছিল না। তবে সেই ধারণা ভেঙেছে গত কয়েক বছরে। মিলেছে বিভিন্ন সভ্যতার খোঁজ। কয়েক বছর আগেই বলিভিয়ায় সন্ধান মিলেছে প্রাচীন শহরের। আনুমানিক ৫০০-১৪০০ সালে সেই নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বলে দাবি করা হয়। এ বার সন্ধান মিলল আরও প্রাচীন এক সভ্যতার। ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হয়েছিল এই সভ্যতার। টিকে ছিল আনুমানিক ৮৫০ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ, এই সভ্যতা ইউরোপীয়েরা আমাজ়নে পৌঁছোনোর প্রায় দু’হাজার বছর শুরু হয়েছিল এই সভ্যতার পথ চলা।


গবেষকদের দাবি, দক্ষিণ-পশ্চিম আমাজ়নে প্রায় ১ লক্ষ ৮৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছিল ‘অ্যাকুইরি সভ্যতা’। এখানে এককালে প্রায় ১২.৫-৩০ লক্ষ মানুষের বাস ছিল বলে অনুমান গবেষকদের। ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের এই গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার’ জার্নালে।


হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা আমাজ়নের জঙ্গলের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে ৪০০টিরও বেশি ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে কিছু ঘরবাড়িও ছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা আকাশ থেকে আমাজ়ন অরণ্যের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে লেসার স্ক্যান করেন। এর জন্য ‘লাইডার’ (লাইট ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) পদ্ধতি ব্যবহার করেন তাঁরা। তা থেকে গবেষকদের দাবি, ওই অঞ্চলে আনুমানিক ২০ হাজারেরও বেশি মাটির ঢিবি ছিল। এবং সেগুলি ছিল মানুষের তৈরি। এর মধ্যে কিছু মাটির ঢিবি ছিল প্রায় ১২৪ একর এলাকা জুড়ে।


স্ক্যান এবং রেডিয়োকার্বন ডেটিং থেকে গবেষকদের অনুমান, ওই অঞ্চলে ১২.৫-৩০ লক্ষ মানুষের বাস ছিল। বস্তুত, আমাজ়ন অরণ্য মোট যে পরিমাণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে, তার মাত্র তিন শতাংশ এলাকাতেই এই গবেষণা চলেছে। তাতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে প্রাক-কলম্বীয় যুগের আমাজ়ন নিয়ে এত দিনের ধারণা। বিজ্ঞানীদের এত দিনে অনুমান ছিল, প্রাক-কলম্বীয় যুগে আমাজ়ন অঞ্চলের জনসংখ্যা এক কোটির মধ্যে সীমিত ছিল। তবে নতুন আবিষ্কার ইঙ্গিত করছে, প্রাচীন আমাজ়নে মোট জনসংখ্যা কয়েক কোটিও হতে পারে। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা গবেষকদলের প্রধান মার্টি পার্সিনেনের কথায়, “এই আবিষ্কার আমাজ়ন অঞ্চল প্রসঙ্গে আগের সব ধারণাকে বদলে দিয়েছে।”


এই ‘অ্যাকুইরি সভ্যতা’ কেমন ছিল, তারও একটি আভাস মিলেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। যদিও বেশির ভাগই এখনও অজানা। গবেষণায় দাবি, প্রাচীন এই সভ্যতার মানুষেরা ভুট্টা, স্কোয়াশ, ম্যানিওক (এক ধরনের সবজি)-এর চাষ করত। ছিল প্রশস্ত রাস্তা। চাষাবাদের পাশাপাশি উদ্যানপালনও করত তারা। এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভাবে বড় বড় পাথর খুব বেশি পাওয়া যায় না। ফলে ‘অ্যাকুইরি সভ্যতায়’ কোনও পাথরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় না। এখানে যে ধ্বংসাবশেষগুলি মিলেছে, তা সবই মাটির। সন্ধান মিলেছে জ্যামিতিক নকশার বিভিন্ন মাটির কাজও। তা ইঙ্গিত দেয়, প্রাচীন এই সভ্যতার জনগোষ্ঠী বেশ সমৃদ্ধ এবং সুসংগঠিত ছিল।


তবে ৮৫০ সালে কী কারণে এই সভ্যতা আচমকা ভেঙে পড়ল, তা এখনও অস্পষ্ট। ঘটনাচক্রে, প্রায় একই সময়ে (৭৫০-৯০০ সালে) মধ্য আমেরিকার মায়া সভ্যতাও ভেঙে পড়ে। দুই সভ্যতার প্রায় একই সময়ে ভেঙে পড়া কি শুধু কাকতালীয়? এই উত্তরও অধরা গবেষকদের কাছে। এ বিষয়ে আরও বিশদ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন