শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে দিশেহারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকরা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১১:০৫ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১১:০৫ অপরাহ্ন
নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে দিশেহারা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকরা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাঠে মাঠে এখন আমন ধানের চারা রোপণে ব্যাস্থ কৃষক কিষাণীরা। সূর্য ওঠার আগেই লাঙ্গল, ট্রাক্টর আর ধানের আটি নিয়ে মাঠে নেমে পড়ছেন চাষিরা। নাচোল, গোমস্তাপুর, শিবগঞ্জ কিংবা সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কাদা-পানিতে একাকার হয়ে নারী-পুরুষ কৃষকেরা দল বেঁধে আমনের চারা রোপণ করছেন। তবে রোপণের এই ভরা মৌসুমে সারের সংকট ও বাড়তি দামে হাসি শুকিয়ে গেছে তাঁদের। সরকারের নির্ধারিত দামে রাসায়নিক সার মিলছে না, সরকারি ভর্তুকির সার চলে গেছে সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে।


কৃষি দপ্তর সারের বরাদ্দ বাড়ালেও মাঠে তার সুফল পাচ্ছেন না প্রান্তিক চাষিরা। অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে খালি হাতে ফিরে বাধ্য হয়ে খুচরা বাজার থেকে চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে তাঁদের। অন্যদিকে ডিলারদের দাবি, সরকারি গুদাম থেকে যে পরিমাণ সার সরবরাহ করা হচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় খুব কম হওয়ায় দু-এক দিনেই তা ফুরিয়ে যাচ্ছে।


জেলার কয়েকটি প্রান্তিক বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিসিআইসি ও বিএডিসি অনুমোদিত বেশিরভাগ ডিলারের ঘরে সারের দেখা নেই। তবে অলিখিতভাবে পাশের খুচরা দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত সার মিলছে। সেখানে সরকারি দামের তুলনায় অনেক বেশি দাম হাঁকা হচ্ছে। 


সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা টিএসপি ১ হাজার ৩৫০ টাকা এবং ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রির কথা এবং এম ও পি এক বস্তার দাম ১০০০/ টাকা ইউরিয়া  এক বস্তার দাম ১৩৫০/ টাকা


অথচ মাঠের কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ডিলারদের কাছে সার না পেয়ে তারা টিএসপি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় এবং ডিএপি ১ হাজার ৪৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। ইউরিয়া এক বস্তার বিক্রয় মুল্য এক হাজার পাঁচশত থেকে  ১৮০০/ টাকা ।ডিলাররা দ্রুত সার শেষ হওয়ার কথা বললেও কৃষকদের কোনো ক্যাশ মেমো দিচ্ছেন না।কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা দোকান খোলার অল্প সময়ের মধ্যেই ‘মজুত শেষ’ বলে দেন এবং সরকারি মূল্যের কোনো ক্যাশ মেমো দিতে চান না।


কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা দোকান খোলার অল্প সময়ের মধ্যেই ‘মজুত শেষ’ বলে দেন এবং সরকারি মূল্যের কোনো ক্যাশ মেমো দিতে চান না।


নাচোল উপজেলার ফতেপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার কাছে কৃষি কার্ড থাকার পরও তিন দিন ঘুরে ডিলারের কাছ থেকে এক বস্তা টিএসপি সার কিনতে পারিনি। ডিলার বলে সার নাকি আসেনি। কিন্তু বাজারের পাশের দোকানে অতিরিক্ত ৪০০ টাকা বাড়িয়ে দিলে সারের কোনো অভাব হয় না। সাধারণ কৃষকদের এভাবে জিম্মি করে পকেট কাটা হচ্ছে।’


শিবগঞ্জের কানসাট বাজারের এক বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলারের দোকানে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সার নেই। ডিলার জানান, জুলাই ও আগস্ট মাসে যে পরিমাণ বরাদ্দ পেয়েছেন, তা দু-তিন দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। বিশাল অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষকের চাহিদার তুলনায় এই বরাদ্দ অনেক কম।


তবে অনুমোদিত ডিলারের পাশের একটি খুচরা দোকানে এক কর্মচারীকে ৫০ কেজির এক বস্তা ডিএপি সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করতে দেখা যায়। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি জানান, মধ্যস্বত্বভোগী ও ডিলারদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সার সংগ্রহ করে তাঁরা খুচরা বিক্রি করেন। সার কয়েক হাত ঘুরে আসায় দাম কিছুটা বেশি পড়ে।


এদিকে গত শনিবার (৮ আগস্ট) চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে আমন ধান চাষে রাসায়নিক সার প্রয়োগকে কেন্দ্র করে ডিলার পয়েন্টগুলোতে কৃষকদের তীব্র ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।


শনিবার ভোর থেকেই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শত শত কৃষক সার পাওয়ার আশায় নাচোল সদরের বিসিআইসি ডিলারদের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভিড় জমান। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সকালে সার পাওয়ার সুবিধার্থে ভোর থেকেই কৃষকেরা ডিলারের দোকানের সামনে জমায়েত হতে শুরু করেন। একপর্যায়ে কৃষক সমাগম বেড়ে গেলে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হয়।


খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা কৃষি অফিস দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কৃষকেরা শান্ত হয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান এবং সুশৃঙ্খলভাবে নিজেদের প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করেন।


কৃষি বিভাগ ও ডিলার সূত্রে জানা যায়, নাচোল উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা কৃষি অফিসের সার্বিক তদারকিতে সদরের পাঁচজন ডিলারের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে সরকারি নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ বস্তা ইউরিয়া, পটাস (এমওপি) ও ডিএপি সার বিক্রি করা হয়।


সার সরবরাহকারী পাঁচটি ডিলার প্রতিষ্ঠান হলো—নইমুদ্দিন বিশ্বাস, ওয়াদুদ এন্টারপ্রাইজ, সিরাজুল ট্রেডার্স, জামিরুল ট্রেডার্স এবং তৌহিদ অ্যান্ড ব্রাদার্স।


দীর্ঘ সময় রোদে পুড়ে ও লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি পোহাতে হলেও শেষ পর্যন্ত সার হাতে পেয়ে কৃষকদের চোখে-মুখে স্বস্তির ছাপ দেখা যায়। তবে উপস্থিত বেশ কয়েকজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মৌসুমের শুরুতেই যদি চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যেত, তবে এভাবে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে এত ভোগান্তি পোহাতে হতো না।


এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সলেহ্ আকরাম বলেন, চাহিদার তুলনায় কেন্দ্রীয়ভাবে বরাদ্দ কিছুটা কম পাওয়ায় সাময়িক এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে ওই দিন বিক্রির মাধ্যমে এলাকার সিংহভাগ কৃষকের চাহিদাই পূরণ সম্ভব হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহেই অবশিষ্ট প্রয়োজনীয় সারের বরাদ্দ পাওয়া যাবে।


এদিকে ১২ আগস্ট বুধবার গোমস্তাপুরে সার সংকটের প্রতিবাদে রহনপুর ইউনিয়নের কৃষকেরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ করেছেন। দুপুরে তাঁরা পর্যাপ্ত সার সরবরাহ এবং সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানান। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিল্লুর রহমানের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত সমাধান চান তাঁরা।


বিক্ষোভকারী কৃষকদের ভাষ্য, আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময় চললেও চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। সময়মতো জমিতে সার দিতে না পারায় তাঁরা ফসলের উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাঁদের দাবি, সার নিয়ে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। 


এ বিষয়ে গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাকলাইন হোসেন বলেন, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সার ডিলার সার উত্তোলন না করায় সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার ডিলার সার উত্তোলন করে কৃষকদের মধ্যে ধাপে ধাপে বিক্রি করবেন। এতে সার সংকট কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।


বিক্ষোভের সময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) উম্মে সালমা রুমা, রহনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সদস্য ও স্থানীয় কৃষকেরা উপস্থিত ছিলেন।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) আতিকুল ইসলাম  জানান, চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় মোট ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত জেলার অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের নিরলস প্রচেষ্টায় লক্ষ্যমাত্রার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৭০  শতাংশের বেশি জমিতে ইতোমধ্যে সফলভাবে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। শিবগঞ্জ, নাচোল ও গোমস্তাপুরসহ পুরো জেলাতেই রোপণ কার্যক্রম পুরোদমে চলছে।


তিনি সারের সার্বিক সরবরাহ ও বরাদ্দ নিয়ে আরও বলেন, চলতি ২০২৬ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আমন মৌসুমে সার বরাদ্দ গত বছরের (২০২৫) তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। 


তবে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত সরকারি সরবরাহ থাকার পরও স্থানীয় ডিলারের অব্যবস্থাপনা, সময়মতো সার না ছাড়া এবং সিন্ডিকেটের কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণেই বাজারে সারের দামে এই চরম অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন কৃষক ও স্থানীয় সচেতন মহল।


চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি মো. আবু সালেহ মোহম্মদ মুশা জানান বাজারে সারের সার্বিক পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে বলেন, সার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে, এমন কোনো লিখিত বা প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ এখনো কোনো কৃষকের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।


তিনি বলেন, অনুসন্ধানে যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন কিংবা নির্ধারিত সরকারি দামের চেয়ে এক টাকাও বেশি নিচ্ছেন, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ডিলারশিপ বা খুচরা লাইসেন্স বাতিল করা হবে।