পত্নীতলায় ৪ শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগ
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার মহেশপুর জুনিয়র স্কুলে চার শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, জালিয়াতি এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হওয়ার পর নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের যোগ্যতা, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও নিয়োগের সময়কাল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট এর সুরাহা চেয়ে লিখিত একাধিক বার অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। তবে কোন প্রতিকার মেলেনি। বরং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুস নিয়ে গড়িমসি করার অভিযোগ উঠেছে।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে প্রকাশ, ২০২২ সালে রাজনৈতিক প্রভাব ও বিপুল অর্থের বিনিময়ে ২০০২ ও ২০০৪ সালের ব্যাকডেটের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং ম্যানেজিং কমিটির নথি ব্যবহার করে চারজন শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগপ্রাপ্তদের কেউ কেউ প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও নিবন্ধন ছাড়াই নিয়োগ পেয়েছেন।
স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ঘোষিত এমপিও তালিকায় বিদ্যালয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর নিয়োগপ্রাপ্ত চার শিক্ষক এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে সাধারণ গণিত বিষয়ের শিক্ষক আহমেদ আউয়ালের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এছাড়া শরীরচর্চা বিষয়ের শিক্ষক সেলিম পারভেজ, কাব্যতীর্থ পদধারী বুলবুলি রানী এবং কৃষি ডিপ্লোমাধারী কাঞ্চন কুমারেরও এনটিআরসিএ নিবন্ধন নেই বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, ২০১১ সালের পর পরিচালিত অনলাইন ব্যানবেইজ জরিপ, বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা এবং স্থানীয়দের সাক্ষ্য অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ২০১৫-১৬ সালের আগে বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। অথচ পরবর্তীতে তারা পূর্বের তারিখ দেখিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক, সাবেক ম্যানেজিং কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কয়েকজন অভিযোগের পক্ষে মত দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়ের এক কর্মচারী বলেন, “অভিযোগে উল্লেখিত চারজন শিক্ষককে ২০১৫ সালের আগে বিদ্যালয়ে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমার কোনো তথ্য নেই।”
একাধিক সাবেক শিক্ষার্থী জানান, তারা ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করলেও ওই শিক্ষকদের কখনো সেখানে দেখেননি। তাদের মতে, যদি প্রকৃতপক্ষে ব্যাকডেটের মাধ্যমে নিয়োগ হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অযোগ্য ও অনিবন্ধিত শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগ সত্য হলে তা শিক্ষার মানের জন্য উদ্বেগজনক। তারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং যোগ্য ও নিবন্ধিত শিক্ষকদের মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগ এবং নিয়মিত নিরীক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সম্প্রতি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা পরিদর্শক সঞ্জয় চন্দ্র মণ্ডল বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। তিনি নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগ এবং অডিট—উভয় বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
তবে স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, তদন্ত কার্যক্রম চলাকালে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে নেতিবাচক মন্তব্য এড়াতে কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলা হয়েছিল। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে শিক্ষা পরিদর্শক সঞ্জয় চন্দ্র মণ্ডল বলেন, “নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগ ও অডিট বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করা হবে।”
অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ধরণের কোনো বিষয়ে আমার সঙ্গে কারও কথা হয়নি। বিষয়টি সম্পর্কে আমি প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে দেখব।”
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মকবুল হোসেন বলেন, ‘তৎকালীন সময়ে কমিটির সভাপতি ও রাজনৈতিক দলের প্রভাবে সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন যে ব্যক্তি বাদী হয়ে অভিযোগ তুলছেন-সে শুনানি তারিখে উপস্থিত হতে পারে না। এভাবে বার বার অভিযোগ করছেন। যা নিয়োগ নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান আর আমাদের সাথে হয়রানি ছাড়া কিছু নই।’