মিলের বর্জ্য পানি মিলছে বিলের পানিতে, বিপর্যয়ের মুখে রক্তদহের পরিবেশ
স্বয়ংক্রিয় চালকলের বর্জ্য ও দূষিত পানিতে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার ঐতিহাসিক রক্তদহ বিল। একসময় দেশীয় মাছের আধার হিসেবে পরিচিত এ বিল এখন প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বিল ও সংলগ্ন খালগুলো থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। এতে মাছ শিকারনির্ভর কয়েকশো জেলে পরিবার জীবিকা সংকটে পড়েছে।
রক্তদহ বিলটি বগুড়ার আদমদীঘি ও নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থিত। ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিলটির আয়তন প্রায় ২২০ হেক্টর এবং বিলকে ঘিরে ২৩টি গ্রামের মানুষের কৃষি ও মৎস্যনির্ভর জীবিকার কথা উঠে এসেছে। আদমদীঘি ও রানীনগর উপজেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটেও রক্তদহ বিলকে পর্যটন স্পট হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকেও রক্তদহ বিলটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাসভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১৭৮৬ সালের আগস্টে ফকির মজনু শাহের অনুসারীদের সঙ্গে ইংরেজ বাহিনীর সংঘর্ষের সঙ্গে এ বিলের নাম জড়িয়ে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংঘর্ষে ব্যাপক হতাহতের ঘটনার পর বিলটির নাম ‘রক্তদহ’ হয়েছে বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সান্তাহার শহর ও আশপাশে গড়ে ওঠা প্রায় ১২টি স্বয়ংক্রিয় চালকলের বর্জ্য ও দূষিত পানি ইরামতি ও ইন্দইল খাল হয়ে রক্তদহ বিলে গিয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বর্জ্য মিশতে থাকায় বিলের পানির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মারা যাচ্ছে এবং মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষার শুরুতে একসময় রক্তদহ বিল ও সংলগ্ন খালে বিপুল পরিমাণ মাছের রেণুপোনা দেখা যেত। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। পাশাপাশি শাপলা, পদ্ম, শালুকসহ নানা জলজ উদ্ভিদের উপস্থিতিও কমে গেছে।
সান্তাহার নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক এম. এস. রোস্-দানী বলেন, ‘একসময় রক্তদহ বিল ছিল সমৃদ্ধ একটি জলাধার। এ বিলের দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ স্থানীয় মানুষের মাছের চাহিদা পূরণ করত। পাশাপাশি বিলটি ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম স্থান। বর্তমানে অটো রাইস মিলের বর্জ্যপানি সরাসরি বিলের পানিতে মিশে যাওয়ায় জলজ পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছ ও জলজ উদ্ভিদ।’
তিনি আরও বলেন, ‘অটো রাইস মিলের বর্জ্যপানি বিলের পানিতে মিশে পরিবেশের সর্বনাশ করছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
স্থানীয়দের দাবি, রক্তদহ বিল ও এর সংলগ্ন জলাশয়ের পরিবেশ রক্ষায় বর্জ্যপানি সরাসরি খাল-বিলে ফেলা বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট চালকলগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।#