শুক্রবার, আগস্ট ২১, ২০২৬

ধ্বংসের ক্ষত মুছে কেশরহাট পৌরসভার নতুন স্বপ্ন: ২০ বছরের মহাপরিকল্পনা

শাহীন সাগর, মোহনপুর ১৮ আগস্ট ২০২৬ ০৯:০৯ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
শাহীন সাগর, মোহনপুর ১৮ আগস্ট ২০২৬ ০৯:০৯ অপরাহ্ন
ধ্বংসের ক্ষত মুছে কেশরহাট পৌরসভার নতুন স্বপ্ন: ২০ বছরের মহাপরিকল্পনা

ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ও ক্ষয়ক্ষতির ক্ষত মুছে ফেলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট পৌরসভা। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল পুরো পৌর ভবন ও ভেতরের সব দাপ্তরিক নথিপত্র, যার ফলে ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ টাকার। 


সেই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে কেশরহাট পৌর প্রশাসক ও মোহনপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জোবায়দা সুলতানার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সুদৃঢ় পদক্ষেপে পৌরসভায় ফিরে এসেছে পূর্ণ কর্মচাঞ্চল্য, গতি পেয়েছে নাগরিক সেবা।

ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠে এবার কেশরহাটকে একটি পরিকল্পিত, টেকসই, জলবায়ু-সহনশীল ও আধুনিক কৃষি-বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ২০২৭ থেকে ২০৪৭ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের এক যুগান্তকারী খসড়া মাস্টার প্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছে।


মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টায় মোহনপুর উপজেলা হলরুমে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (আইইউজিআইপি)-এর আওতায় এই খসড়া মাস্টার প্ল্যানের ওপর পরামর্শকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

পৌর প্রশাসক জোবায়দা সুলতানার দূরদর্শিতায় প্রণীত এই মাস্টার প্ল্যানে কেশরহাটের অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার আমূল পরিবর্তনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।


পানি সরবরাহ ও পয়নিষ্কাশন

বর্তমানে কোনো সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল পৌরবাসীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ২৪.৬৮ কিলোমিটার পানি সরবরাহ পাইপলাইন স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে (স্বল্পমেয়াদে ৮.১৩ কিমি, মধ্যমেয়াদে ৫.৬২ কিমি এবং দীর্ঘমেয়াদে ১০.৮৪ কিমি)।


সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামো

পৌরসভার ৬৬.২৭ কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্কের মধ্যে বেহাল দশায় থাকা ৪১.৭৭ কিলোমিটার (৬৩ শতাংশের বেশি) সড়ক সংস্কার ও পুনর্র্নিমাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ২৩.৫৬ কিলোমিটার নদী-খাল পুনর্দখলমুক্ত ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে।


আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

প্রতিদিন উৎপন্ন ১২ টন কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন ও আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা ও নগর পরিকল্পনা

২০৪৭ সালে পৌরসভার সম্ভাব্য জনসংখ্যা ৩০,৭২০ জন বিবেচনায় রেখে কৃষিজমি ও পরিবেশ সংরক্ষণ করে পরিকল্পিত নগরায়ণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নাগরিক সুবিধার জন্য ১টি এসএমজি স্ট্যান্ড, ৪টি নেবারহুড কমপ্লেক্স, ৫টি পার্ক/খেলার মাঠ, ১টি প্যাসেঞ্জার টাউন, ১টি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, ২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি গণশৌচাগার ও ৫টি ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় স্থাপন করা হবে।


পৌর প্রশাসক জোবায়দা সুলতানা জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পৌরসভার সেবা স্তব্ধ হয়ে গেলেও আমরা নিরলসভাবে কাজ করে তা পুনরুদ্ধার করেছি। এখন লক্ষ্য ২০৪৭ সালের পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক কেশরহাট গড়ে তোলা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম, কেশরহাট পৌর প্রকৌশলী সরদার মো. জাহাঙ্গীর আলম, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লায়লা আরজুমানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া আইইউজিআইপি প্রকল্পের সিনিয়র নগর পরিকল্পনাবিদ ও ডেপুটি টিম লিডার শামাউন আল নূর, আরবান প্ল্যানার ফারহানা রহমান এবং প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার এ.বি.এম. জহিরুল ইসলাম মাফি সভায় অংশ নেন। 


স্থানীয় পর্যায়ে কেশরহাট পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সহকারী অধ্যাপক খুশবর রহমান, পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি কামরুজ্জামান আবুহেনা, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও ব্যবসায়ী ওসমান আলী, ছাত্রনেতা সেলিম রেজা, কেশরহাট বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মাদ আলী বাচ্চু, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক রাইসুল ইসলাম রাসেলসহ সর্বস্তরের অংশীজনরা পৌর প্রশাসকের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও উন্নয়নমুখী এই পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।


প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই খসড়া মাস্টার প্ল্যান দ্রুত বাস্তবায়িত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে।