চুরির অপবাদে তরুণীর চুল কেটে, জুতার মালা পরিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন, গ্রেপ্তার ২
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলায় চুরির অপবাদ দিয়ে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী ও তার দুই ভাই-বোনকে গাছে বেঁধে মারধরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ওই তরুণীর গলায় জুতার মালা পরানো ও মাথার চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ঘটনার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবারের এ ঘটনায় তরুণীর মা শুক্রবার রাতে সখিপুর থানায় মামলা করেন। এরপর শনিবার ভোরে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান থানার ওসি মোফাজ্জল হুসাইন।
গ্রেপ্তার দুইজন হলেন- আফসানা সরদার (৫০) ও আমির (৩০)। মামলায় তাদেরসহ ছয়জনের নাম দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
তরুণীর পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য, তারা ভেদরগঞ্জের একটি গ্রামে ভাড়া থাকেন। সখিপুরের ছৈয়াল কান্দি এলাকার মুদি দোকানি আবুল মোল্লার ছেলে মনির মোল্লা ওই তরুণীকে বিভিন্ন সময় উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দিতেন বলে পরিবারের অভিযোগ। এ নিয়ে স্থানীয়রা তাকে সতর্কও করেছিলেন বলে পরিবারের দাবি।
মঙ্গলবার সকালে ওই তরুণী তার ১৩ বছর বয়সী ছোট বোন ও সাত বছর বয়সী ভাইকে নিয়ে মনিরের দোকানে কেনাকাটা করতে যান। সেখানে মনির তাকে অশালীন কথা বলেন এবং রাতে দেখা করার প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ করেন তরুণী।
এর প্রতিবাদ করলে মনির তিন ভাই-বোনকে দোকানের পাশের ফৌজিয়া সরদারের বাড়িতে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখেন বলে অভিযোগ। পরে তাদের হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয় বলে পরিবারের দাবি।
একপর্যায়ে তাদের চিৎকারে স্থানীয় লোকজন সেখানে গেলে তাদের বিরুদ্ধে দোকানের মালামাল চুরির অভিযোগ তোলা হয়। পরে মনিরসহ কয়েকজন তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন এবং তরুণীর চুল কেটে দেন বলে অভিযোগ।
খবর পেয়ে দুপুর ১২টার দিকে সখিপুর থানা পুলিশ তিন ভাই-বোনকে উদ্ধার করে। পরে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।
তরুণীর মা ফাতেমা বেগম বলেন, তার মেয়েকে মনির কুপ্রস্তাব দিতেন। ঘটনার দিন প্রতিবাদ করায় তিন সন্তানকে একটি বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে তাদের মারধর করা হয় এবং মেয়ের চুল কেটে দেওয়া হয়।
ফাতেমা বেগম বলেন, “কুপ্রস্তাবের প্রতিবাদ করায় মেয়েকে চুরির অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। জীবন ও সম্মানের জন্য আমরা অন্য এলাকায় আশ্রয় নিয়েছি।”
তিনি ঘটনার বিচার দাবি করেন।
তরুণীর অভিযোগ, মঙ্গলবার চাল, ডাল ও তেল কিনতে গেলে মনির তাকে কুপ্রস্তাব দেন। এর আগেও তিনি বিভিন্ন সময় তাকে কুপ্রস্তাব দিতেন। ঘটনার দিন প্রতিবাদ করায় তাকে ও তার ভাই-বোনকে জোর করে একটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
তার অভিযোগ, সেখানে তাকে একটি কক্ষে হেনস্তা করা হয়। পরে চিৎকার করলে লোকজন জড়ো হয়। তখন তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ তোলা হয়। এরপর তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর ও চুল কেটে দেওয়া হয়। তার ভাই-বোনকেও গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।
মামলার পর আসামিদের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ওই তরুণী। তার বাবা ফারুক বেপারী বলেন, হুমকির কারণে তারা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজন নারীকে ওই তরুণীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখতে দেখা যায়। একপর্যায়ে এক যুবক তার হাত আরও শক্ত করে গাছের সঙ্গে বাঁধছেন। পরে এক নারী তার গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেন। ভিডিওতে তরুণীর চুল কেটে দেওয়ার দৃশ্যও দেখা যায়। তার ছোট বোনকেও একটি খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা জসিম বেপারী বলেন, ওই তরুণীকে যেভাবে গাছে বেঁধে মারধর ও চুল কেটে দেওয়া হয়েছে, তা নিন্দনীয়। ঘটনার বিচার হওয়া উচিত।
সখিপুর থানার ওসি মোফাজ্জল হুসাইন বলেন, প্রথমে তরুণীর মা একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। পরে সেটি প্রত্যাহার করে নেন। এরপর শুক্রবার রাতে আবার লিখিত অভিযোগ দিলে মামলা করা হয়।
তিনি বলেন, মামলার পর দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
চুরির অপবাদ দিয়ে তরুণী ও দুই শিশুকে গাছে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে এলাকায় গিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পর থেকে তারা পলাতক। তাদের মোবাইল ফোনে কল করা হলেও বন্ধ পাওয়া গেছে।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ