বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬

চুপি চুপি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা! পাঁকে পড়া আরব শেখদের পিঠে ছুরি বসিয়ে ‘আপনি বাঁচলে..’ বললেন ট্রাম্প?

সোনার দেশ ডেস্ক ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:৩৮ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:৩৮ অপরাহ্ন
চুপি চুপি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা! পাঁকে পড়া আরব শেখদের পিঠে ছুরি বসিয়ে ‘আপনি বাঁচলে..’ বললেন ট্রাম্প?

হুথি হামলায় ক্ষতবিক্ষত সৌদি আরব। জ্বালানি পরিকাঠামো বাঁচাতে হিমসিম খাচ্ছে রিয়াধ। এ-হেন বিপদে পাশে নেই পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ‘বন্ধু’রা। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো, পিছন থেকে ‘ছুরি মারল’ আমেরিকাও! অত্যন্ত গোপনে ইরান মদতপুষ্ট ইয়েমেনি শিয়া বিদ্রোহীদের সঙ্গে ‘অলিখিত চুক্তি’ সেরেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেখে ভুরু কুঁচকোচ্ছে ‘একঘরে’ হয়ে পড়া আরব রাষ্ট্র।



সম্প্রতি, হুথি ও আমেরিকার গুপ্ত বৈঠকের কথা ফাঁস করে সংবাদসংস্থা রয়টার্স। গত ১৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, ওমানের রাজধানী মাস্কাটের মার্কিন দূতাবাসে ইয়েমেনের বিদ্রোহী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা সারেন যুক্তরাষ্ট্রের পদস্থ কর্তাদের একাংশ। সেখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে ওমান।


রয়টার্সের প্রতিবেদনে হুথিদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেওয়া মার্কিন শীর্ষকর্তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। রিপোর্টে তাঁদের পরিচয় শুধুমাত্র ‘দূতাবাসের কর্মী’। অন্য দিকে, ইয়েমেনি বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির তরফে আলোচনায় অংশ নেন মহম্মদ আবদুলসালাম এবং আবদেলমালিক আল-আজিরি। এঁরা দু’জনেই ইরান মদতপুষ্ট শিয়া সংগঠনটির শীর্ষপদে রয়েছেন। প্রথম জনের নামে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে আমেরিকা।


হুথি-মার্কিন বৈঠকের ফলাফলের ব্যাপারে বেশ কিছু বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছে ইজ়রায়েল ও কাতারের জনপ্রিয় গণমাধ্যম দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল এবং আল-জাজ়িরা। তাদের দাবি, লোহিত সাগরে আমেরিকা ও ইহুদিদের কোনও জাহাজে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইয়েমেনের ওই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তবে, সৌদির পণ্যবাহী জলযান ছাড় পাবে না বলে স্পষ্ট করেছে তাঁরা।


হুথিদের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে গণমাধ্যমে মুখ খোলেন মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনার কথা স্বীকার করেছেন তিনি। ভান্সের কথায়, ‘‘আমরা সরাসরি আনসার আল্লাহ-র (যাদের দুনিয়া চেনে হুথি নামে) সঙ্গে কথা বলছি। পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।’’ এর জেরে দু’পক্ষ কোনও সমঝোতায় পৌঁছোবে কি না, তা নিয়ে অবশ্য স্পষ্ট কোনও ইঙ্গিত দেননি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট।


সামরিক ও কূটনীতিবিদদের একাংশের অবশ্য দাবি, অচিরেই হুথিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সারবে আমেরিকা। বর্তমানে মরিয়া হয়ে সেই চেষ্টা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ব্যাপারে মার্কিন বিদেশ দফতরের এক মুখপাত্র বলেন, ‘‘পশ্চিম এশিয়ায় আমাদের মূল স্বার্থের সঙ্গে লোহিত সাগর এবং সেখানে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকা খুবই জরুরি। সেই লক্ষ্যে তৎপর হয়েছে ওয়াশিংটন।’’


শিয়াপন্থী হুথি বিদ্রোহী বা আনসার-আল্লাহর জন্ম উত্তর ইয়েমেনের সাদা প্রদেশে। গোড়ার দিকে দুর্নীতি-সহ একাধিক ইস্যুতে সরকারের বিরোধিতা করত তারা। শুধু তা-ই নয়, সৌদি আরবের কথামতো যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলে এই সংগঠন। ফলে অচিরেই রিয়াধের সঙ্গে সাপে-নেউলে সম্পর্ক তৈরি হয় তাদের। অন্য দিকে, হুথিদের সমূলে ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লাগে সৌদি প্রশাসন।


গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে রিয়াধের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আনসার-আল্লাহকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ইয়েমেনের তৎকালীন সরকার। কিন্তু, এতে ফল হয় হিতে বিপরীত। হুথিদের পাশে এসে দাঁড়ায় শিয়া-শাসিত ইরান। ফলে পাল্টা প্রত্যাঘাত শুরু করে তারা। এর জন্য তাদের হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ সরবরাহে কোনও রকম কার্পণ্য করেনি তেহরান।


২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। ফলে সেখান থেকে উৎখাত হয় ওই উপসাগরীয় রাষ্ট্রটির সরকার। ঠিক এর পরের বছর আনসার আল্লাহের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নামে সৌদি আরব। ইরান মদতপুষ্ট সংগঠনটিকে চক্রব্যূহে ঘিরে ফেলতে একাধিক স্থানীয় ভাড়াটে ফৌজ গড়ে তোলে রিয়াধ। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় অত্যাধুনিক হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ।


তবে সৌদির যাবতীয় চেষ্টা সত্ত্বেও হুথিদের দমানো যায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে ২০২২ সালে ইরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘর্ষবিরতি সেরে ফেলে রিয়াধ। এতে অনুষ্ঠানিক ভাবে লড়াই থামলেও স্থানীয় ভাড়াটে ফৌজকে অস্ত্র দেওয়া কোনও দিনই বন্ধ করেনি খনিজ তেল সমৃদ্ধ ওই আরব রাষ্ট্র। এতে ভয়ঙ্কর এক গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়ে ইয়েমেন। সেটা সামলে ধীরে ধীরে পাল্টা প্রত্যাঘাতের রাস্তায় হাঁটতে থাকে আনসার আল্লাহ।


এই পরিস্থিতিতে সৌদির পাশে এসে দাঁড়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পশ্চিম এশিয়ার খনিজ তেল সমৃদ্ধ দেশটির সঙ্গে দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে আমেরিকার। দু’তরফের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কয়েক কোটি ডলারের। হুথিদের জন্য সেটা নষ্ট হোক, তা কখনওই চায়নি ওয়াশিংটন। তা ছাড়া, গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি রিয়াধের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সারে যুক্তরাষ্ট্র। এর উপর ভিত্তি করে আরব রাষ্ট্রটিতে রয়েছে তাদের একাধিক সামরিক ঘাঁটি।


সাবেক সেনাকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, সৌদির ছাউনিগুলিতে হুথি হামলার আশঙ্কায় তটস্থ ছিল আমেরিকা। আর তাই ২০২৪ সালে ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের একাধিক গুপ্তঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। পরের বছর তাদের গায়ে সন্ত্রাসবাদী তকমা সেঁটে দেয় ওয়াশিংটন। পাল্টা লোহিত সাগরে মার্কিন ও ইসরায়েলি পণ্যবাহী জাহাজকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে লাগাতার নিশানা করতে থাকে ওই শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী।


গত বছরের অগস্টে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় বিমান হামলা চালায় ইজ়রায়েল। তত দিনে অবশ্য উপসাগরীয় দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিজস্ব সরকার গড়ে ফেলেছে ইরান মদতপুষ্ট এই শিয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠী। আর তাই অতর্কিত আক্রমণে সংগঠনটির কোমর ভাঙতে চেয়েছিল ইহুদি বায়ুসেনা। তাতে অবশ্য কিছুটা সফল হয় তেল আভিভ।


২০২৫ সালে ইসরায়েলি বিমানহানায় প্রাণ হারান হুথি প্রধানমন্ত্রী আহমেদ আল-রাহাবি। এ ছাড়া, আনসার আল্লাহর মন্ত্রিসভার আরও ১২ জন সদস্য ও বেশ কয়েক জন সামরিক কর্মকর্তাকে উড়িয়ে দেয় ইহুদি বায়ুসেনা। এই সামরিক অভিযানের সাঙ্কেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন লাকি ড্রপ’। কিন্তু, এই ক্ষতি সামলে খুব দ্রুত নিজেদের সংগঠিত করে ফেলে ইরান মদতপুষ্ট ওই বিদ্রোহী গোষ্ঠী।


অন্য দিকে, গত বছর হুথিদের সঙ্গে সংঘর্ষবিরতি চুক্তি সারে আমেরিকা। সেই সমঝোতা মেনে ইসরায়েল বাদে অন্যান্য দেশের পণ্যবাহী জাহাজে হামলা চালানো বন্ধ করে আনসার আল্লাহ। সূত্রের খবর, ওমানের মার্কিন দূতাবাসে হওয়া ওই যুদ্ধবিরতির মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী। যদিও তাতে সামান্য রদবদল হচ্ছে বলেই জানা গিয়েছে।


রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সমঝোতায় লোহিত সাগরে ইসরায়েলি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে ছাড় দিয়েছে হুথি গোষ্ঠী। এ বার তাদের লক্ষ্যবস্তু শুধুমাত্র সৌদি আরব। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর মোকা কব্জা করে তারা। পাশাপাশি, বাব এল-মান্দেব প্রণালীর একাধিক দ্বীপও চলে গিয়েছে ইরান মদতপুষ্ট বিদ্রোহীদের দখলে।


সৌদি আরবের অর্থনীতি পুরোপুরি ভাবে খনিজ তেলের উপর নির্ভরশীল। মূলত দু’টি সামুদ্রিক রাস্তায় তরল সোনা গোটা বিশ্বে সরবরাহ করে থাকে রিয়াধ। সেগুলি হল, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালী। এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ ভাবে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। জোড়া শত্রুর মোকাবিলায় হরমুজ অবরুদ্ধ রেখেছে তেহরান।


ফলে তেল বাণিজ্য চালু রাখতে সৌদির একমাত্র ভরসা ছিল বাব এল-মান্দেব। মোকা পতনের দিনে সেটাও যে চিরতরে বন্ধ হতে চলেছে তা অনুমান করতে রিয়াধের সমস্যা হয়নি। আর তাই ওই দিনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে অন্তত দু’বার ফোনে কথা বলেন সৌদির যুবরাজ তথা প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ বিন সলমন। আমেরিকার কাছে বিমান হামলার সাহায্য চান তিনি। যদিও পত্রপাঠ তা খারিজ করে যুক্তরাষ্ট্র, খবর সূত্রের।


সৌদির দিক থেকে আমেরিকার মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ইয়েমেনের সাবেক মার্কিন উপরাষ্ট্রদূত নাবিল খুরি। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘ইরান যুদ্ধে নেমে লেজে-গোবরে দশা হয়েছে ট্রাম্পের। তাই নতুন কোনও সংঘর্ষে জড়াতে চাইছেন না তিনি। আর তাই হুথিদের সঙ্গে অলিখিত বোঝাপড়ায় যেতে চাইছে ওয়াশিংটন, যেখানে তাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকবে।’’


মজার ব্যাপার হল, হুথিদের সামলাতে বর্তমানে ইজ়রায়েলের সাহায্য নিতে চাইছে সৌদি সরকার। যদিও পশ্চিম এশিয়ার ইহুদি রাষ্ট্রটিকে এখনও স্বীকৃতি দেয়নি রিয়াধ। অন্য দিকে, পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে ভারতও। কারণ, আরব রাষ্ট্রটি থেকে বিপুল পরিমাণে জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে নয়াদিল্লি। তেল আভিভের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রয়েছে কেন্দ্রের। ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে বাঁক নেয় সেটাই এখন দেখার।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন