মঙ্গলবার, নভেম্বর ০৩, ২০২৬

অসহায়দের খাবার খাওয়াতেন হালিম, সেই তাঁকেই তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যাচেষ্টা

মো. শাহীন সাগর, মোহনপুর: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ০৩:০৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
মো. শাহীন সাগর, মোহনপুর: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ০৩:০৬ অপরাহ্ন
অসহায়দের খাবার খাওয়াতেন হালিম, সেই তাঁকেই তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যাচেষ্টা

প্রতি মাসের দুই শুক্রবার তাঁর হোটেলে রান্না হতো বাড়তি মুরগির মাংস। সেই খাবার নিজের জন্য নয়, হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সমাজের অসহায় মানুষের জন্য। কারও ঘরে খাবার না থাকলে কিনে দিতেন চাল, অভাবী পরিবারের বাজার করে দিতেন। অর্থাভাবে পরীক্ষার ফি দিতে না পারা শিক্ষার্থীদের পাশেও দাঁড়াতেন। নিজের হোটেল ব্যবসার আয় থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করতেন আব্দুল হালিম সরদার (৪৭)। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন মানবিক মানুষ হিসেবে।


অথচ সেই হালিমকেই রাতের খাবার খাওয়ার সময় বাড়ি থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে রাস্তায় ফেলে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। মাথায় রডের আঘাতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেও থামেনি হামলা। মৃত ভেবে তাঁকে রাস্তায় ফেলে রেখে যায় হামলাকারীরা। এসময় তাঁর পকেটে থাকা ব্যবসার প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ করেছে পরিবার।


গুরুতর আহত হালিমের মাথায় তিনটি সেলাই দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে অক্সিজেনের সহায়তায় চিকিৎসাধীন তিনি। এরই মধ্যে তিন মাস ধরে মেরুদণ্ডের সমস্যায় ভুগছেন এই হোটেল ব্যবসায়ী। কখনো হাসপাতালের বিছানায়, কখনো বাড়িতে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। আবার জীবিকার তাগিদে কোমরবন্ধনী পরে অসুস্থ শরীরেই হোটেলে কাজ করতে হচ্ছে তাঁকে।


সোমবার (২ নভেম্বর) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ধুরইল উত্তরপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলায় একই এলাকার আতাউর (৪৫), তাঁর দুই ছেলে মহসিন (২২) ও মুন্না (১৮) এবং বোনজামাই রুবেলের (২৮)সহ অজ্ঞাতনামা ৩জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন আহতের পরিবার। আতাউরের বিরুদ্ধে মাদক কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


খাবার খেতে বসে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ

আহত হালিমের স্ত্রী খালেদা বিবি জানান, ঘটনার রাতে তাঁর স্বামী বাড়িতে বসে রাতের খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময় আতাউর, তাঁর দুই ছেলে ও বোনজামাইসহ অজ্ঞাত ৩জন লোহার রড, হাসুয়া, হাতুড়ি ও বাঁশের লাঠি নিয়ে তাঁদের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করেন। এরপর জোরপূর্বক হালিমকে বাড়ি থেকে তুলে রাস্তায় নিয়ে যান। সেখানে লোহার রড দিয়ে মাথায় আঘাত করলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপরও তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়।


স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে তাঁকেও কিল-ঘুষি ও চড়-থাপ্পড় মারা হয় বলে অভিযোগ করেন খালেদা বিবি।

তিনি বলেন, স্বামীকে রাস্তায় ফেলে পেটানোর সময় চিৎকার করে প্রতিবেশীদের সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু এলাকায় তাফসিরুল কোরআন মাহফিল চলায় মাইকের শব্দে তাঁর চিৎকার কেউ শুনতে পাননি। এ সুযোগে হামলাকারীরা তাঁর স্বামীকে বেধড়ক পিটিয়ে পকেটে থাকা ব্যবসার প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে যায়। পরে তাঁকে মৃত ভেবে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যায়।


মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার, মাথায় তিন সেলাই

পরে স্থানীয় ভ্যানচালক মতিন ও তাঁর ভাই লতিব এবং হালিমের ভাই শফিকুল, চাচা আবজাল, চাচাতো ভাই দোলন ও তাঁর ছেলে খালেক তাঁকে উদ্ধার করেন। প্রথমে মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে জরুরি বিভাগে অক্সিজেন দেওয়া হয় এবং মাথায় তিনটি সেলাই দেওয়া হয়। পরে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় তাঁকে।


ছেলেকে বেঁধে মারধরের ঘটনা ও জমিজমা বিরোধের জেরে হামলা?

হালিমের ওপর হামলার পেছনে কয়েক দিন আগের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছে বলে দাবি করেছে তাঁর পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যার পর আতাউরের একটি মোবাইল ফোন চুরির সন্দেহে হালিমের ছেলে খালেককে ধরে নিয়ে যান আতাউর ও তাঁর লোকজন। পরে আতাউরের দোকানের পাশে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে তাঁকে মারধর করা হয়।


ওই ঘটনার পর আতাউর হালিমকে ফোন করে ঘটনাস্থলে যেতে বলেন। তবে হালিম জানান, তাঁর ছেলে চুরি করে থাকলে দায় তার, তিনি সেখানে যেতে পারবেন না। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আতাউর তাঁকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন বলে পরিবারের অভিযোগ।


এদিকে খালেককে উদ্ধার করতে হালিমের ছোট ভাই শফিকুল জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন। অভিযোগ, সেখান থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে শফিকুল ঘটনাস্থলে গেলে আতাউর নগদ সাত হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খালেকের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন উল্লেখ করে অনুরোধ করার পরও সাত হাজার টাকা দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে হয় বলে পরিবারের দাবি। তবে ওই ঘটনায় পরে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। খালেককে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়।


পরিবার ও স্থানীয়দের ধারণা, খালেককে মারধরের ঘটনার জের এবং স্থানীয় আবু বক্কার সিদ্দিক ওরফে মহব্বতের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে বিরোধ-এই দুই বিষয়কে কেন্দ্র করে হালিমের ওপর হামলা হয়ে থাকতে পারে। তবে হামলার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


মানবতার মানুষ হালিমের ওপর হামলায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় অসহায় মানুষের কাছে হালিম ছিলেন পরিচিত এক মানবিক মুখ। প্রতি মাসের দুই শুক্রবার মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সমাজের অসহায় মানুষকে নিজের হোটেলে মুরগির মাংস দিয়ে একবেলা খাবার খাওয়াতেন। কারও ঘরে খাবার না থাকলে চাল কিনে দেওয়া, অভাবী পরিবারের বাজার করে দেওয়া কিংবা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফি জোগানোর মতো কাজও করতেন তিনি।


নিজের সামর্থ্যের মধ্যে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর অভ্যাস। সেই মানুষটির ওপর এমন হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এদিকে হালিমকে হাসপাতালে পাঠানোর পর স্থানীয় জনতা অভিযুক্ত রুবেলকে মারধর করেছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


ঘটনার খবর পেয়ে মোহনপুর থানা পুলিশের এসআই ইয়ামিন আলী, এসআই আব্দুর রহিম ও এএসআই আশরাফুল ইসলামসহ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি।

অভিযোগ পেলে তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।