বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২৬

নিবন্ধিত ৮৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয় না

সোনার দেশ ডেস্ক ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ১২:২০ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ১২:২০ অপরাহ্ন
নিবন্ধিত ৮৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয় না
ফাইল ছবি

দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ রাজস্ব নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে। শুধু তাই নয়, অফিসিয়ালি বা কাগজে-কলমে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় না কিংবা জমা দিলেও শূন্য ভ্যাট দেখিয়ে রিটার্ন জমা দিচ্ছে।


জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের গোয়েন্দা পর্যালোচনায় এসব পরিসংখ্যান উঠে এসেছে।

ভ্যাট গোয়েন্দার গোয়েন্দা প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই মাসে দেশে নিবন্ধিত ৮ লাখ ৩০ হাজার ২৩২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৭৪৫ টি প্রতিষ্ঠান কোনো ভ্যাট দেখায়নি বা রিটার্ন জমা দেয়নি।


অর্থাৎ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ৮৯.৩ চার শতাংশ ওই মাসে হয় রিটার্ন জমা দেয়নি, নয়তো শূন্য রিটার্ন দিয়েছে। বিপরীতে মাত্র ১০.৬৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান রিটার্নে ভ্যাট প্রদর্শন করেছে।


প্রতিবেদন বলছে, জুলাই মাসে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫ লাখ আটষট্টি হাজার তিনশ চুয়াত্তরটি প্রতিষ্ঠান কোনো রিটার্ন জমা দেয়নি। যা মোট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ৬৮.৪৬ শতাংশ। অন্যদিকে, রিটার্ন জমা দেওয়া ২ লাখ ৬১ হাজার আটশ আটান্নটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১ লাখ ৭৩ হাজার তিনশ একাত্তরটি প্রতিষ্ঠান শূন্য রিটার্ন দিয়েছে। অর্থাৎ রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোরও বড় একটি অংশ কোনো ভ্যাট প্রদর্শন করেনি।


সব মিলিয়ে জুলাই মাসে মাত্র ৮৮ হাজার ৪৮৭ প্রতিষ্ঠান রিটার্নে ভ্যাট দেখিয়েছে। ভ্যাট ব্যবস্থায় বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন থাকলেও তাদের বড় অংশের কাছ থেকে রাজস্ব না আসার বিষয়টি এনবিআরের জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


এ বিষয়ে ভ্যাট গোয়েন্দার ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, “ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ রিটার্ন জমা না দেওয়া বা শূন্য রিটার্ন দেওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। তবে শূন্য রিটার্ন দেওয়া মানেই যে প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে, তা নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকলে বা নির্দিষ্ট সময়ে করযোগ্য লেনদেন না থাকলে শূন্য রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনা করেও কোনো প্রতিষ্ঠান রিটার্ন না দিলে বা প্রকৃত লেনদেন গোপন করে শূন্য রিটার্ন দিলে তা অনিয়মের পর্যায়ে পড়তে পারে।


তিনি আরও বলেন, এ কারণে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত অবস্থা যাচাই, রিটার্ন না দেওয়ার কারণ অনুসন্ধান এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরীক্ষার আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে ভ্যাট ফাঁকি শনাক্তের পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের পরিধিও বাড়ানো সম্ভব হবে। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়মিত যাচাই না করলে ভ্যাটের আওতা বাড়লেও রাজস্ব আদায় বাড়বে না। এ ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে নিবন্ধন হালনাগাদ, রিটার্ন না দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের লেনদেন নিরীক্ষার আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছি।


ভ্যাট গোয়েন্দার প্রতিবেদন পর্যালোচনায় আরো দেখা গেছে, জুলাই মাসে দেশে মোট ভ্যাট জমা হয়েছে ৩ হাজার ২৬৬ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা এসেছে মাত্র ৩৩৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে। অর্থাৎ মোট ভ্যাটের প্রায় ৮০.৬৭ শতাংশ দিয়েছে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের মাত্র মাত্র শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ।


অন্যদিকে বাকি ৮ লাখ ২৯ হাজার ৮৯৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাট জমা হয়েছে প্রায় ৬৩১ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠান সংখ্যা অনুপাতে হিসাব করলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে গড় জমার পরিমাণ দাঁড়ায় মাসে প্রায় ৭ হাজার ৬০০ টাকা। তবে এই গড়ের মধ্যে রিটার্ন না দেওয়া ও শূন্য রিটার্ন দেওয়া প্রতিষ্ঠানও রয়েছে; ফলে এটি প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ভ্যাট পরিশোধের পরিমাণ নয়।


বড় প্রতিষ্ঠানগুলোরও রিটার্ন না দেওয়ার প্রবণতা

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেশের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ-ভ্যাট) পর্যায়েও রিটার্ন না দেওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বড় করদাতা হিসেবে বিবেচিত এই ইউনিটে নিবন্ধিত ১১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জুলাই মাসে রিটার্ন জমা দিয়েছে ৮৭টি প্রতিষ্ঠান। বাকি ২৪টি প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমা দেয়নি। অথচ এলটিইউ-ভ্যাট কমিশনারেট ওই মাসে ১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট আদায় করেছে। বড় করদাতাদের একটি অংশের রিটার্ন না দেওয়ার বিষয়টি এ খাতের তদারকি ও অনুসরণের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।


ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। সেখানে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩৫টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে রিটার্ন জমা দিয়েছে মাত্র ৩৫ হাজার ৮০৫টি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৪ শতাংশ রিটার্ন জমা দিয়েছে। ওই কমিশনারেট জুলাই মাসে ১৯১ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় করেছে।


আর ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯০ হাজার ১১২টি। এই কমিশনারেটের অধীনে জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে রিটার্ন দাতাদের ১৯ হাজার ৪৬৬টি প্রতিষ্ঠান শূন্য রিটার্ন দিয়েছে। রিটার্নদাতাদের মধ্যে শূন্য রিটার্নের হার প্রায় ৭০ শতাংশ বলে অধিদপ্তরের পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।


পর্যটননির্ভর কক্সবাজারের চিত্রও উদ্বেগজনক। সেখানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১২ হাজার ৩৩৫টি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে জুলাই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৭ কোটি টাকার কিছু বেশি। ওই মাসে ১ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট দিয়েছে—এমন কোনো প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া রিটার্নদাতাদের প্রায় ৬৪ শতাংশ শূন্য রিটার্ন জমা দিয়েছে।


রাজশাহী, রংপুর ও যশোর ভ্যাট কমিশনারেটেও শূন্য রিটার্নের হার বেশি। এসব এলাকায় রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬৮ থেকে ৭৩ শতাংশ কোনো ভ্যাট প্রদর্শন করেনি।


ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ রিটার্ন জমা না দেওয়া কিংবা শূন্য রিটার্ন দেওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। এসব প্রতিষ্ঠানের কতটি বাস্তবে ব্যবসা পরিচালনা করছে, কতটি নিষ্ক্রিয় এবং কতটির নিবন্ধন হালনাগাদ বা বাতিল করা প্রয়োজন। সে বিষয়ে স্পষ্ট চিত্র না থাকলে প্রকৃত রাজস্ব সক্ষমতা নিরূপণ কঠিন হবে বলে মনে করে ভ্যাট গোয়েন্দা। সে কারণে ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুহম্মদ জাকির হোসেন এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পুরো বিষয়টি অবগত করা ও পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য সম্প্রতি চিঠি দিয়েছেন বলে জানা গেছে।


এনবিআর সূত্র বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ৪১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৯২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের প্রধান তিনটি খাত-মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আয়কর ও আমদানি-রপ্তানি শুল্ক-কোনোটিতেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ভ্যাট আদায়ে। গত জুলাই-সেপ্টেম্বরে ৪৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। ফলে ভ্যাট আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।


ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে চলতি অর্থবছর থেকে প্রতি মাসের বদলে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের বিধান চালু করা হয়। এর আগে মাসে মাসে এ রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। যদিও ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে ও ভ্যাট আদায়ে স্থবিরতা দেখে গত সেপ্টেম্বর থেকে আবারও মাসভিত্তিক ভ্যাট রিটার্নে ফিরে এসেছে এনবিআর।


তথ্যসূত্র: ঢাকাপোস্ট