লোকসান মাথায় নিয়ে চলছে আলুর চাষ
গেল মৌসুমে আলুর উৎপাদনের দাম পায়নি কৃষকরা। তবে সেই লোকসান কাটিয়ে এবারও আলুচাষে নেমেেেছ তারা। এবার আশা করছে উৎপাদনের খরচ বাড়বে। কিন্তু এবার গেলবারের তুলনায় আলুচাষের জমি কমেছে ৬ হাজার হেক্টর। ইতোমধ্যে আলুর বীজ বপন করা শেষ হয়েছে। এখন পরিচর্যা করছে কৃষকরা। আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোধ দমনে কৃষকদের প্রতি আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।
রাজশাহী জেলায় এবার ৩৪ হাজার ১০৯ হেক্টর জমিতে আলুচাষ করছেন কৃষকরা। গেল বছরে ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে আলুচাষ করা করা হয়েছিল। গেলবারে কৃষি অফিসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলুচাষ। যা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এবার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে। যা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।
বর্তমানে আলুখেতের পরিচর্যা, সেচ, আগাছা দমন ও রোগবালাই প্রতিরোধে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা থাকায় এবার ফলন ভালো হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে এবারও দাম নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন কৃষকরা।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, তানোরে ১২ হাজার ২৫৫ হেক্টর, বাগমারা উপজেলায় ৬ হাজার ৪৮৫ হেক্টর, মোহনপুরে ৪ হাজার ৪৯৫, পবায় ৩ হাজার ৪১০ হেক্টর, বাঘায় ২ হাজার ৮৫৭, গোদাগাড়ীতে ২ হাজার ৯২ হেক্টর, দুর্গাপুরে ১ হাজার ৫২০ হেক্টর, পুঠিয়ায় ৭৭০ হেক্টর, , চারঘাটে ১৮০ হেক্টর, বোয়ালিয়ায় ৩৫ হেক্টর, মতিহারে ১০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় আলু চাষ করা হয়েছে।
তানোর উপজেলার বকুলতলা গ্রামের জহরুল ইসলাম বলেন, গেলবার আলুচাষে বেশ লোকসান গুনতে হয়েছে। উৎপাদনের অর্ধেকের অর্ধেকও খরচ উঠেনি। ১ লাখ টাকা খরচ করে পাওয়া গেছে মাত্র ২০ হাজার টাকা। গেল বছরের ঋণ শোধ করতে পারেনি। তাও এবার লাভের আশায় আলুচাষ করছি। এবার যেন দাম পাওয়া যায় সরকারকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
বাগমারা উপজেলার বীরকয়া গ্রামের আব্দুস সালাম বলেন, এবার সময়মতো বীজ রোপণ করেছি। আবহাওয়াও অনুকূলে আছে। এখন নিয়মিত সেচ ও সার দিচ্ছি। আলুর গাছ ভালো অবস্থায় আছে। যদি কোনো বড় রোগ না লাগে আর বাজারে ন্যায্য দাম পাই, তাহলে লাভ ভালোই হবে।
মোহনপুর উপজেলার সিংহমারা গ্রামের শরিফুল ইসলাম বলেন, আলু চাষে খরচ আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। বীজ, সার আর শ্রমিকের মজুরি সবই বেশি। তারপরও ফলন ভালো হলে সেই খরচ উঠে আসবে। এখন প্রতিদিন খেতে গিয়ে পরিচর্যা করছি। গত বছর অনেক কৃষক আলু চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তারপরও এবার ঝুঁকি নিয়ে চাষ করেছি। এখন পর্যন্ত আলুর অবস্থা ভালো। সরকার যদি সংরক্ষণ আর বাজার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করে, তাহলে আমরা উপকৃত হবো।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকেব সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে কৃষকদের। শীতকালীন এই মৌসুমে আলুর লেইট ব্লাইট বা মড়ক রোগ মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়কালে আলুর মড়ক রোগের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে নিম্ন তাপমাত্রা, কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘলা আবহাওয়া ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হলে এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। রোগের আক্রমণে প্রথমে গাছের গোড়ার দিকের পাতায় ছোপ ছোপ ভেজা হালকা সবুজ গোলাকার বা বিভিন্ন আকারের দাগ দেখা যায়, যা দ্রুত কালো রং ধারণ করে এবং পাতা পচে যায়। সকাল বেলা মাঠে গেলে আক্রান্ত পাতার নিচে সাদা পাউডারের মতো জীবাণু দেখা যায়।
কৃষকদের করণীয় সম্পর্কে বলা হয়, রোগের অনুকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথে রোগ প্রতিরোধের জন্য ৭ দিন পর পর অনুমোদিত ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করে গাছ ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। যদি ইতোমধ্যে ফসল রোগে আক্রান্ত হয়ে যায় তবে, জমিতে সেচ বন্ধ করা এবং ৪/৫ দিন পর পর অনুমোদিত ছত্রাকনাশক সঠিক মাত্রায় স্প্রে করতে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে আলুর আবাদ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি হয়েছে। কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত বীজ, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই দমনে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো রোগবালাইয়ের খবর পাওয়া যায়নি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ভালো উৎপাদনের আশা করা যাচ্ছে। আরও কিছু জমিতে আলু চাষ হবে। সেগুলো হলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।