বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে সফল ই-কমার্স উদ্যোক্তা মুরাদ পারভেজ
বাবা গ্রামে আম কিনে দেশের নানাপ্রান্তে নিয়ে বিক্রি করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে এসে ছেলে মুরাদ পারভেজও আমের ব্যবসা শুরু করলেন। তবে বাবার মতো আম নিয়ে কোথাও যাননি। অনলাইনে অর্ডার নিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন। লোকেরা তাচ্ছিল্যের সুরে বলতেন, ‘বাপে আম বেচত। ব্যাটাও তাই শুরু করল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও চাকরি পেল না।’
লোকের কথা কানে তুলতেন না মুরাদ। ফেসবুকে পেইজ খুলে তিনি আমের অর্ডার নিতেন। প্রথম বছরেই ভাল সাড়া পান তিনি। তাই শীতের মৌসুমে শুরু করেন খাঁটি খেজুর গুড় বিক্রি। মুরাদ পড়াশোনা করেছেন পুষ্টিবিজ্ঞানে। তিনি পুষ্টিকর খাবার খাওয়াবেন-এটাই তার পণ। আর এই নীতি তাঁকে করে তুলেছে সফল উদ্যোক্তা। ২০২০ সালে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যাত্রা শুরু করা মুরাদ এখন জেলার অন্যতম বড় উদ্যোক্তা। তিনি কখনও চাকরির পেছনে ছোটেননি। নিজের প্রতিষ্ঠানেই সরাসরি চাকরি দিয়েছেন ৩৫ জনকে।
মুরাদ পারভেজের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামে। বাবার নাম মুন্তাজ আলী। মুরাদ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক করেছেন খাদ্য প্রযুক্তি ও পুষ্টিবিজ্ঞানে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য পুষ্টি বিষয়ে। এই পুষ্টিবিদ এখন প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার কেজি খাঁটি গুড় ক্রেতাদের দিচ্ছেন।
মুরাদের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের নাম ম্যাংগো লাভার। এখান থেকেই আমের পাশাপাশি খেজুর গুড় ও লিচু বিক্রি করেন তিনি। মুরাদ পবা উপজেলার বজরাপুর, কাঁঠালবাড়ি ও দুর্গাপুর উপজেলার আমগাছি গ্রামের গাছিদের ঠিক করেছেন তাকে খাঁটি খেজুর গুড় তৈরি করে দেওয়ার জন্য। রস ছাড়াই শুধু রাসায়নিক দিয়ে খেজুর গুড় তৈরি কিংবা গুড়ে চিনির মিশ্রণ দেওয়া নিয়ে যখন রাজশাহীর গুড়ের বদনাম বাড়ছেই, তখন বজরাপুর গ্রামের ৪১ জন, কাঁঠালবাড়ি গ্রামের ১৭ জন এবং আমগাছি গ্রামের ৪৮ জন গাছি খাঁটি গুড় তৈরি করছেন মুরাদের ক্রেতাদের জন্য। ভাল দামে এসব গুড় বিক্রি হচ্ছে। গাছিরাও ভাল দাম পাচ্ছেন।
রোববার (১১ জানুয়ারি) ভোরে বজরাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সূর্যের আলো ফোটার আগেই গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস নামিয়ে আনছেন। তারপর বাড়ির সামনে বড় তাওয়ায় রস জ্বাল দেওয়ার কাজ শুরু হয়। প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা ধরে জ্বাল দেওয়ার পর রস শুকিয়ে লালি গুড়ে রূপ নেয়। সেই গুড় হাতনা দিয়ে নাড়তে নাড়তে হয় বীজ গুড়। আবার লালি গুড়কে আরেকটু বেশি জ্বাল দিয়ে নির্দিষ্ট পাত্রে রেখে তৈরি করা হয় পাটালি গুড়। এই তিন ধরনের গুড়েরই সমান চাহিদা মুরাদের ক্রেতাদের কাছে।
মুরাদের জন্য বাড়ির সামনে গুড় তৈরি করছিলেন বজরাপুর গ্রামের গাছি মো. বাবু। তিনি জানালেন, মালিকদের কাছ থেকে তার শতাধিক খেজুর গাছ ইজারা নেওয়া আছে। এক মৌসুমের জন্য গাছের ইজারামূল্য ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। তারা বাবা-ছেলে রস নামিয়ে আনেন। তারপর গুড় করেন। তার মতে, এ গ্রামের কোনো গাছি গুড়ে ভেজাল দেন না। সবাই খাঁটি গুড় তৈরি করেন।
বাবু বলেন, ‘আমরা খাঁটি গুড় তৈরি করি, প্রতি কেজিতে মুরাদ ভাইয়ের কাছ থেকে দাম পাই ৩০০ টাকা। মুরাদ ভাই ব্যবসা শুরু করার আগে তো সবাই যেমন-তেমন করে গুড় করত। তখন ৪০-৫০ টাকা কেজিতে গুড় বেচতে হতো। এখন ভাল দাম পাই, খাঁটি গুড় বানাই। কেউ ভেজাল প্রমাণ করতে পারলে ১ লাখ টাকা পুরস্কার।’
ম্যাংগো লাভার ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা ও পুষ্টিবিদ মুরাদ পারভেজ বলেন, ‘আমার গ্রামে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। শুরুতে যখন আম, লিচুর অর্ডার নিতে শুরু করলাম। তখন সবাই বলত যে, বাপে আম বেচত। ব্যাটাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে এসে আমের ব্যবসা শুরু করল। লেখাপড়া করে কী লাভ? কিন্তু আমি পড়াশোনা করেছি পুষ্টিবিজ্ঞানে। আমার নীতিই হলো যে পুষ্টিকর খাবার খাওয়াব। এটাই করে আসছি। তাই সাড়া পেয়েছি।’
তিনি জানান, প্রতিদিন এখন প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন ক্রেতাকে গুড় পার্সেল করতে হচ্ছে। প্রতিদিন গুড়ের পরিমাণ দাঁড়ায় আড়াই থেকে তিন হাজার কেজি। এসব কাজের জন্য তার অফিসেই এখন চাকরি করছেন ৩৫ জন। এছাড়া প্রায় ৬ হাজার গাছ থেকে রস নামানো ও গুড় তৈরির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে আরও প্রায় ৮০ জন গাছির। আগে অনেকে গুড়ের দাম না পেয়ে খেজুর গাছ কেটে ফেলেছেন। এখন আর কেউ গাছ কাটেন না।
মুরাদের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ম্যাংগো লাভার প্রতিষ্ঠানে এখন এক কেজি পাটালি গুড় ও লালি গুড় বিক্রি করেন ৩৯০ টাকায়। আর বীজ বা চকলেট গুড় বিক্রি করেন ৪৯০ টাকায়। দাম বেশি হলেও যারা খাঁটি চান, তারা মুরাদের কাছেই অর্ডার করেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে প্রায়ই ক্রেতাদের কাছ থেকে অভিযোগ আসে যে, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে খাঁটি খেজুর গুড়ের অর্ডার দিয়ে ক্রেতারা ভেজাল গুড় পেয়েছেন। এ জন্য দপ্তরের কর্মকর্তারা নিয়মিত গুড় তৈরির কার্যক্রম মনিটরিং করছেন। অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ইব্রাহিম হোসেন মুরাদ পারভেজের গাছিদের বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন।
তার মতে, এই গাছিরা খাঁটি গুড় করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই অভিযোগ পাই যে, ক্রেতারা প্রতারিত হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে নামসর্বস্ব পেইজ থেকে অর্ডার করার কারণে এমনটি হয়। এদের সবাইকে খুঁজে বের করার সক্ষমতাও অধিদপ্তরের নেই। তবে মুরাদের গাছিরা খাঁটি গুড় করেন। আমি নিজে গিয়ে এটাই দেখেছি। সততার কারণে মুরাদ দ্রুত সময়েই সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন।’