জামায়াত আমিরের এক্স ‘হ্যাকড’: ছরওয়ারের গ্রেপ্তার নিয়ে পুলিশে দ্বিমত
জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাকড হওয়ার ঘটনায়’ বঙ্গভবনের কর্মী ছরওয়ারে আলমকে হাতিরঝিল থানায় দায়ের হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
তবে এই গ্রেপ্তার নিয়ে পুলিশের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য এসেছে। কারো চাপে বঙ্গভবনের কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিনা, মিন্টো রোড এলাকায় উঠেছে সেই প্রশ্নও।
জামায়াত আমিরের এক্স হ্যাকের অভিযোগে মঙ্গলবার মধ্যরাতে মতিঝিল থানা এলাকা থেকে বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার ছরওয়ারে আলমকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো মামলার তথ্য পুলিশের তরফে আসেনি।
এর মধ্যে রাত পৌনে ১০টার দিকে সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ডিএমপির পক্ষ থেকে বার্তা দিয়ে জানানো হয়, বিষয়টি নিয়ে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে হাজির হচ্ছেন।
রাত সাড়ে ১০টায় মিন্টো রোডে অবস্থিত ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হতে আমন্ত্রণ জানায় ডিএমপি।
সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণবার্তা পাওয়ার পর যোগাযোগ করা হলে ডিবির দুজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আটক ওই ব্যক্তির (ছরোয়ারে আলম) বিরুদ্ধে হ্যাকের ঘটনায় যুক্ত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তারা বলেছেন, মূলত রাজনৈতিক চাপে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
কর্মকর্তাদের কয়েকজন ‘সিনিয়রদের’ এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন বলেও এক কর্মকর্তা দাবি করেন।
এরপর নির্ধারিত সময়ের প্রায় ২৫ মিনিট পর সংবাদ সম্মেলনে আসেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
এ ধরনের সংবাদ সম্মেলনে কোনো ইউনিটের প্রধান উপস্থিত হলে তার সঙ্গে ঊর্ধ্বতন আরো কয়েক কর্মকর্তাও আসেন।
তবে বুধবার রাতে শফিকুল ইসলামকে দেখা গেল গাড়িতে করে একাই ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আসতে। পরে তার সঙ্গে ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের ডিসি তালেবুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রথমে একটি লিখিত ভাষ্য পাঠ করেন শফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, “জামায়াত আমিরের ‘এক্স আইডি হ্যাকড’ হওয়ার বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে হাতিরঝিল থানায় একটি জিডি করা হয়। এটা সাইবার সংক্রান্ত হওয়ায় ডিবির ওপর তদন্তভার ন্যস্ত করা হয়।
“এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর মতিঝিল এলাকা থেকে ছরওয়ারে আলম নামে এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। এই ঘটনায় ইতোমধ্যে হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা হয়েছে। নিবিড় তদন্তের জন্য মামলাটির তদন্তভার ডিবির হাতে ন্যাস্ত করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা ব্যক্তির কর্মস্থল থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে। স্বচ্ছ তদন্তের স্বার্থে জব্দকৃত আলামত ফরেন্সিক পরীক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘অহেতুক’ বিভ্রান্তি না ছড়ানোর জন্য এবং সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে পুলিশকে সহযোগিতা করার জন্য সকলকে অনুরোধ করেন ডিবি প্রধান।
ডিবি প্রধানের বক্তব্যের সংবাদ সম্মেলনে প্রথম প্রশ্ন আসে, ছরওয়ারে আলমকে কী হাতিরঝিল থানার মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে?
জবাবে ডিবি কর্মকর্তা বলেন, ‘জি’।
প্রাথমিক তদন্তে গ্রেপ্তার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘যথেষ্ট প্রমাণ’ পাওয়ার কথাও বলেন তিনি।
তবে এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, তার মোবাইল ও কর্মস্থলে ব্যবহৃত কম্পিউটারের হার্ড ড্রাইভ জব্দ করা হয়েছে। এগুলোর ফরেন্সিক পরীক্ষার পর বিষয়টি বিস্তারিত বলতে পারবেন তারা।
এদিকে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ছরওয়ারে আলমকে গ্রেপ্তার নিয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েন। এ কারণে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত নিতে অনেক বিলম্ব হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক জানতে চান, ডিবির ভেতরে দ্বিধা বিভক্তির যে তথ্য ছড়িয়ে আছে, তা কতখানি সত্যি।
জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সত্য নয়। মামলা হওয়ার পর পুলিশ আসামি ধরেছে।
ঘটনার সঙ্গে আপনারা কী ছরওয়ারে আলমের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা ফরেনসিক রিপোর্ট না এলে তো বলা যাবে না।”
তাহলে আটকের প্রায় ১৬-১৭ ঘণ্টা পর কীসের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছেন প্রশ্ন করা হলে ডিবি কর্মকর্তা বলেন, “তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে নাৃ।”
তখন এক সাংবাদিক বলেন, “তাহলে আপনারা তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করেছেন কিনা?”
জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা না, হাতিরঝিল থানার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে।”
এক সংবাদিক তখন জানতে চান, “তাহলে কী বিষয়টা এরকম যে জামায়াতের পক্ষ থেকে হাতিরঝিল থানায় দায়ের করা মামলার এফআইআরে ছরওয়ারে আলমের নাম আছে এবং এ কারণে এখন তাকে গ্রেপ্তার দেখাচ্ছে হাতিরঝিল থানার পুলিশ?”
এই প্রশ্নে ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম শুধু ‘জি’ বলে উত্তর দেন।
ছরওয়ারেকে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে কিনা জানতে চাইলেও শুধু ‘জি’ বলেই উত্তর দেন তিনি।
এরপর এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, তাহলে কি ব্যবহৃত ডিভাইসগুলো এখন ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হবে?
এবার বিস্তারিত না বলে ‘জি’ বলে জবাব দেন শফিকুল ইসলাম।
তাহলে যার অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাকড’ হয়েছে, সেটি কি জব্দ করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তদন্তের স্বার্থে যা যা করা প্রয়োজন, সবই করা হবে। মামলা তো কেবল আজ দায়ের হয়েছে।”
এরপর ধন্যবাদ দিয়ে উঠে যেতে চান শফিকুল ইসলাম। তখন এক সাংবাদিক আরেকটি প্রশ্ন নিয়ে উঠে দাঁড়ান।
তিনি প্রশ্ন করেন, “আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, আপনার ডিবির তদন্তকারী টিম এই ঘটনার সঙ্গে ওই ব্যক্তির কোনো সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তারে রাজি হননি। আপনি তাদেরকে প্রেশার ক্রিয়েট করেছেন এবং যার কারণে আজকে তারা এই সংবাদ সম্মেলন বর্জন করেছেন।”
সাংবাদিকদের কথা শেষ হওয়ার আগেই ডিবি প্রধান বলেন, “মামলা হয়েছে, মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেৃ এটাই। মামলা হয়েছে তো এটার। এটা তো আর জিডির তদন্তের বিষয় নয়।”
এসময় কয়েকজন সাংবাদিক একসঙ্গে প্রশ্ন করতে উদ্যত হন। এর মধ্যে একজন প্রশ্ন করেন, “আগে তো আপনারা জিডির তদন্ত করেছেন। সেই তদন্তে ঘটনার সঙ্গে এই ব্যক্তির কোনো সংশ্লিষ্ট পেয়েছেন কিনা?”
জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, “এখন যেহেতু মামলা হয়েছে, সেটাতো (জিডি) এটার সঙ্গে মার্জ হবে।”
এই প্রশ্নের জবাবের শেষ অংশে তিনি বলেন, “যথেষ্ট প্রমাণ আছে।” তবে কী ধরনের প্রমাণ আছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলেননি এই ডিবি কর্মকর্তা।
এরপর ধন্যবাদ বলে আবারও সংবাদ সম্মেলন শেষ করতে চাইলে আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, “বাদী তো আগে অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে জিডি করেছিলেন। তাহলে বাদী কিসের ভিত্তিতে পরে ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে আসামি করে মামলা করলেন, বাদী জানলেন কী করে? এই জিডি তো আপনারা তদন্ত করেছিলেন?”
জবাবে ডিএমপির ডিবি প্রধান বলেন, “মামলাটা হাতিরঝিল থানা নিয়েছে, আপনারা থানার সঙ্গে কথা বলুন।”
তবে বিষয়টি নিয়ে হাতিরঝিল থানায় যোগাযোগ করা হলে ওসি ফোন ধরেননি।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, “পুলিশের সিনিয়রদের সিদ্ধান্ত ছাড়া যে এ ধরনের মামলা হওয়া সম্ভব নয়, এটা সবাই জানেন। উনি (ডিএমপির ডিবি প্রধান) শুধু শুধু হাতিরঝিল থানার কোর্টে বলটা পাঠিয়ে দিলেন।”
মোটামুটি সাড়ে চার মিনিটে সংবাদ সম্মেলন করে তড়িঘড়ি করে গাড়িতে ওঠেন ডিবি প্রধান।
জামায়াতের আমিরের ‘এক্স’ হ্যান্ডেল থেকে একটি ‘নারী বিদ্বেষী’ পোস্ট আসায় রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়ায়।
ওই পোস্টে বলা হয়, “নারী প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান বিভ্রান্তিকর বা কুণ্ঠাবোধের নয়, বরং নীতিগত। নারীদের নেতৃত্বে আসা উচিত, এটা আমরা বিশ্বাস করি না। জামায়াতে এটা অসম্ভব। আল্লাহ এটা অনুমোদন করেননি।
“আমরা বিশ্বাস করি, আধুনিকতার নামের নারীদেরকে ঘরের বাইরে ঠেলে দেওয়া হলে তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় এবং নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়। এটা পতিতাবৃত্তি ছাড়া কিছু নয়।”
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ