সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬
উৎপাদন বাড়ছে, স্বস্তিতে কৃষক

বিএমডিএর আধুনিক সেচ প্রযুক্তিতে বদলে যাচ্ছে বরেন্দ্র জনপদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৪ অপরাহ্ন
বিএমডিএর আধুনিক সেচ প্রযুক্তিতে বদলে যাচ্ছে বরেন্দ্র জনপদ

দীর্ঘদিনের খরাপ্রবণ ও পানিসংকটের অঞ্চল হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র এলাকা এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেশের অন্যতম উৎপাদনশীল কৃষি অঞ্চলে। এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, খাল পুনর্খনন এবং ভূ-পরিস্থ পানির ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থায় এসেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, যার সুফল পাচ্ছেন হাজার হাজার কৃষক।


বিএমডিএ সূত্রে জানা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত ১ হাজার ৬৩৯টি ফোর্স মোড পাম্পের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৬২ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে একসময় যেখানে বছরে একটি ফসল হতো, সেখানে এখন তিনটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। এতে উপকৃত হচ্ছেন প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কৃষক পরিবার।


এছাড়া মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদী থেকে ১০০টি লো-লিফট পাম্প (এলএলপি) ব্যবহার করে আরও প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হচ্ছে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ১ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা।


পানির অপচয় রোধে ২০০৩ সাল থেকে চালু করা হয়েছে স্মার্ট কার্ডভিত্তিক প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থা। এর ফলে কৃষকরা নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি ব্যবহার করছেন এবং সেচ ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকছে।


পরিবেশ রক্ষায় এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৩০ কিলোমিটার খাল এবং ১ হাজার ৯১টি পুকুর পুনর্খননের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা হয়েছে।


গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার সেচ নালা (বারিড পাইপ) এবং ১৮৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হয়েছে এবং বাজারজাতকরণে সময় ও খরচ কমেছে।


এছাড়া ২৩৪টি স্থাপনার মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ মানুষের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।


সদর উপজেলার কৃষক জুবায়ের হোসেন বলেন, “আগে পানির জন্য চাষাবাদ করা কঠিন ছিল। এখন খাল খনন ও আধুনিক সেচের কারণে সহজেই পানি পাওয়া যাচ্ছে। এতে খরচ কমেছে, ফলনও বেড়েছে।


একই এলাকার আব্দুল মাতিন জানান, একসময় যে জমি অনাবাদি পড়ে থাকত, এখন সেখানে নিয়মিত ফসল হচ্ছে। বিএমডিএ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই অঞ্চলের কৃষিতে পরিবর্তন এসেছে।”


চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিএমডিএ রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আল মামুনুর রশিদ জানান, মহানন্দা নদীর পানি ব্যবহার করে আরও প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর খরাপ্রবণ এলাকায় সেচ সুবিধা বাড়াতে দুটি বড় প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।


এর মধ্যে একটি ডাবল লিফটিং পদ্ধতি প্রকল্প (ব্যয় প্রায় ৮৩৯ কোটি টাকা) এবং অন্যটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব প্রশমন প্রকল্প (ব্যয় প্রায় ৫৮৭ কোটি টাকা)।


প্রস্তাবিত প্রকল্পে ২১০ কিলোমিটার খাল ও ১৫০টি পুকুর পুনর্খনন, ৫ লাখ ৫০ হাজার গাছ রোপণ এবং সৌরচালিত সেচযন্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ৬ কিলোমিটার খাল ও দুটি বড় বিল পুনর্খননের কাজ চলছে।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারহাত তাসনীম বলেন, বিএমডিএর কার্যক্রম শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়াচ্ছে না, বরং পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই মডেলকে আরও সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় অবদান রাখা সম্ভব।


সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং পরিকল্পিত সেচ ব্যবস্থার সমন্বয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা দেশের অন্যান্য খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এই অগ্রগতি টেকসই করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ।