প্লাস্টিকের দুই রাসায়নিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেশের মানুষ
দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক ‘থ্যালেট’ ও ‘বিসফেনল’-এর সংস্পর্শে আসছে মানুষ। প্লাস্টিক নমনীয় করতে ব্যবহার করা এসব রাসায়নিক নিয়ে কোনো নীতিমালা নেই।
একটি সাম্প্রতিক সিচুয়েশন রিপোর্টে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুই রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে হুমকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য।
প্লাস্টিককে নমনীয় ও টেকসই করতে থ্যালেট ও বিসফেনল ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই রাসায়নিক ‘এন্ডোক্রাইন-ডিসরাপ্টিং কেমিক্যাল’ বা হরমোনের ভারসাম্য নষ্টকারী হিসেবে পরিচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব রাসায়নিক প্রজনন সমস্যা, শারীরিক বিকাশজনিত ত্রুটি এবং ক্যানসারের মতো রোগের কারণ হতে পারে।
প্রতিবেদনে রাসায়নিক দুটির ব্যবহার সীমিত করতে জরুরিভাবে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া রাসায়নিক সুনির্দিষ্ট প্রবিধান তৈরি এবং মোড়কে এ সংক্রান্ত তথ্য বাধ্যতামূলক যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার (এসডো) নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, ‘প্লাস্টিকের এসব অত্যন্ত বিষাক্ত উপাদানের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া আমাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক হবে।’ তিনি আরও বলেন, এই রাসায়নিকগুলো শিশু এবং প্রজননক্ষম নারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। কিন্তু দেশের বিদ্যমান আইনে এ নিয়ে কিছু বলা নেই।
ইন্টারন্যাশনাল পলিউট্যান্টস এলিমিনেশন নেটওয়ার্কের (আইপেন) বৈশ্বিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এসডো এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। গতকাল বুধবার এক অনুষ্ঠানে এসডোর সহকারী কর্মসূচি কর্মকর্তা সাদমীন সাদাফ জাহান প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ লাখ টনের বেশি প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়। দেশের অভ্যন্তরীণ প্লাস্টিক বাজারের আকার এখন ৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি) ডলারের বেশি। এই খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ২০ শতাংশ।
সাধারণত সরকারি নীতি ও আলোচনায় প্লাস্টিক দূষণের দৃশ্যমান দিকগুলোই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু প্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন, বিশেষ করে থ্যালেট ও বিসফেনলের মতো ক্ষতিকর উপাদানের ব্যবহার নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না।
সাদমীন সাদাফ জাহান জানান, দেশের প্লাস্টিক শিল্প মূলত আমদানি করা কাঁচামাল ও রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে প্রায় ১৫টি চালানে বিসফেনল এ (বিপিএ) আমদানি করা হয়েছে।
এই রাসায়নিকগুলো বিভিন্ন খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। খাবার প্যাকেজিং, প্লাস্টিকের পাত্র, শিশুদের খেলনা, স্কুলের সরঞ্জাম, থার্মাল পেপার, পিভিসি পণ্য, আঠা, প্রলেপ এবং ছাপার কালিতেও এসব উপাদান থাকে।
খেলনা ও স্কুলে ব্যবহৃত জিনিসপত্রের কারণে শিশুরা এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে। এ ছাড়া খুচরা বিক্রেতাদেরকে বিপিএ-যুক্ত রসিদ নাড়াচাড়া করতে হয়। অন্যদিকে শিল্প এলাকার দূষিত পানি, বাতাস ও খাবারের মাধ্যমেও সাধারণ মানুষ এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসছেন।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ২০২৩ সালের একটি গবেষণার বরাত দিয়ে সাদমীন জানান, সাভার ও টঙ্গীর মতো শিল্প এলাকায় থ্যালেটের উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এটি ওই এলাকার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ২০২২ সালে এসডোর এক গবেষণায় দেখা যায়, স্কুলের শিশুদের ব্যবহৃত ৪৭টি ইরেজারের (রাবার) মধ্যে ৩০টিতেই থ্যালেট ছিল।
একই বছর এসডো এবং কোরিয়ার ওয়ানজিন ইনস্টিটিউটের একটি যৌথ গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন দোকান থেকে সংগৃহীত ৩৯টি থার্মাল পেপারে ছাপানো রসিদ বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় বিপিএর উপস্থিতি মিলেছে।
এসডোর মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘প্লাস্টিক খাত দ্রুত বড় হচ্ছে, কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক থেকে সুরক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসব ক্ষতিকর উপাদান জনস্বাস্থ্য, শ্রমিক ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়েই থাকবে।’
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক তাহমিনা শিরিন বলেন, ‘রাসায়নিকযুক্ত খাবার গ্রহণ দেশে অসংক্রামক ব্যাধি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।’ এই গবেষণার তথ্যপ্রমাণগুলো সরকারি নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত বলে মত দেন তিনি।
এসডোর সভাপতি সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ বলেন, এই প্রতিবেদনটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।