শুক্রবার, মে ০১, ২০২৬

চকের নদীর অস্তিত্ব বিলীন, বুকজুড়ে ফসলের সমারোহ, নদীর জমি বেদখল

সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৪১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৪১ অপরাহ্ন
চকের নদীর অস্তিত্ব বিলীন, বুকজুড়ে ফসলের সমারোহ, নদীর জমি বেদখল

প্রায় তিনশো বছর আগে পদ্মা নদীর প্রবাহিকায় সৃষ্টি হওয়া দেশের সর্ব পশ্চিমের মনাকষা ইউনিয়ন দিয়ে বয়ে আসা এক সময়ের খরস্রোতা চকের নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে। নদীটি এখন আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। 


এই নদীটির অবস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, বিনোদপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নে। মনাকষা ইউনিয়নের সর্বপশ্চিমে ভারত সীমান্ত থেকে নদীটি মনাকষা বাজারের দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দূর্লভপুর ইউনিয়নের তর্তিপুর এলাকায় গিয়ে পাগলা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। এবং পরবর্তীতে পদ্মা নদীতে গিয়ে যুক্ত হয়। ভৌগোলিকভাবে নদীটি তর্তিপুর, বিনোদপুর, চৌকা, মনাকষা ও দূর্লভপুরসহ প্রায় ৮টি মৌজার জমির ওপর দিয়ে এক সময় প্রবাহিত হয়েছে।


খরস্রোতা এই নদীকে কেন্দ্র করে নদীতীরে গড়ে  উঠেছিল সমৃদ্ধ জনপদ, উত্তরবঙ্গের প্রাচীনতম আদিনা ফজলুল হক কলেজ, দাদনচক হেমায়েত উচ্চ বিদ্যালয়, মনাকষা হুমায়ুন রেজা উচ্চ বিদ্যালয়, মনাকষা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ প্রায় ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চৌকা ও মনাকষাসহ কয়েকটি বিওপি, বড় বড় হাটবাজার, মনাকষা শ্মশান ঘাট, তত্তীপুর শ্মশান ঘাট, মনাকষা নীল কুঠির কারখানাসহ (বর্তমানে বিলুপ্ত) অসংখ্যা ছোট বড় প্রতিষ্ঠান। 


নদীর পানি ব্যবহার করে সহস্রাধিক কৃষক জমিতে সেচ দিতেন। শত শত জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং বর্ষা মৌসুমে নৌকাই ছিল যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। দেশ বিদেশের বড় বড় বণিকরা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এই নদীপথে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। নদীটি ছিল এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু একদিকে কালের বিবর্তন অন্যদিকে ভারতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর পদ্মা নদীয় প্রবাহ অন্যদিকে মোড় নেয়ায় এ নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।


নদীর প্রবাহ বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে এক শ্রেণির ভূমিদস্যু নদীর হাজার হাজার বিঘা জমি নানা কৌশলে দখল করে নিয়েছে। এ নদীটি স্বাধীনতা উত্তরকালেও ভারতীয় সীমান্ত থেকে তত্তীপুর পর্যন্ত ১২-১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১৫০-২০০মিটার প্রস্থ ছিল। কিন্তু চকের নদী আজ অস্তিত্ব বিলুপ্তপ্রায়। নদীর বুকজুড়ে হাজার হাজার বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ হচ্ছে। 


জানা গেছে, এ নদীর বুকজুড়ে বছরে তিনবার বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন হয়। তারমধ্যে ধান, পাট, ভুট্টা, সবজি, কলাই, গমসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল উল্লেখ্যযোগ্য। নদীর অধিকাংশ অংশে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হয়ে খালে পরিণত হয়েছে, আবার অনেক জায়গায় নদীর জায়গা দখল করে চাষাবাদ বা বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি থাকে না।


মনাকষা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল হালিম, আবু হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসনে মন্টু, বদিউর রহমান বুদ্ধুসহ অনেকে বলেন, একসময় এই নদীতে সারাবছর পানি থাকত। আমরা এখানে গোসল করতাম, মাছ ধরতাম, নৌকায় চলাচল করতাম। কত আনন্দ হতো। এখন নদীটা শুধুই মরা খাল। 


একই এলাকার কৃষকরা জানান, নদী শুকিয়ে যাওয়ায় শ্যালোমেশিনের ও মর্টারের (সাবমার্সিবল পাম্প) মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, একটি নদী কেবল পানির উৎস নয়, বরং একটি অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চকের নদীর মতো ছোট নদীগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার ওপর। দেশীয় মাছের প্রজাতি কমে যাচ্ছে, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে।


স্থানীয়দের দাবি, নদীর জমি দখলমুক্ত করে খনন করতে হবে। নদী খনন হলে পূর্বের অবস্থানে ফিরে গেলে জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হবে।  


এ ব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তৌফিক আজিজ অসুস্থতার কারণে কোন মন্তব্য করেন নি। শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাজহারুল ইসলাম জানান, নতুন যোগদান করেছি। নদীটি সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে এখন শুনলাম। জরুরি ভিত্তিতে পরিদর্শন পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নদীর জমি পুনরুদ্ধার করে নদীর পুনজীবন ফিরিয়ে আনা হবে। 


চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবিব বলেন, নদীটির হালচাল সম্পর্কে বর্তমানে আমার জানা নেই। তবে এ নদীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় নদীর জমি পুনরুদ্ধার করে খাল খনন প্রকল্পের আওয়াতায় এনে কৃষি কাজ, মাছচাষসহ জীববৈচিত্র ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে  প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।