ট্রাইব্যুনাল: ইনুর মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় যেকোনো দিন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ যেকোনো দিন এ মামলার রায় ঘোষণা করতে পারে।
বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। গত ২ এপ্রিল আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়েছিল।
শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ ও আবদুস সাত্তার পালোয়ান। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী, সিফাত মাহমুদ শুভ ও আবুল হাসান।
শুনানি শেষে প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “হাসানুল হক ইনু ১৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের সকল কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। সুপিরিয়র কমান্ড, ইন্ডিভিজুয়াল রেসপনসিবিলিটি এবং ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি—সবকিছুই আদালতে তুলে ধরা হয়েছে।”
গত ১৯ জুলাই ও ৪ অগাস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ইনুর ফোনালাপ প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বলে তিনি জানান।
প্রধান কৌঁসুলি বলেন, “কথোপকথনের মধ্যে কারফিউ জারি, আন্দোলনকে বিভক্ত করে জঙ্গি কার্ড খেলা এবং কুষ্টিয়ায় পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়গুলো ছিল। ছাত্র-জনতাকে হত্যার যে পরিকল্পনা ও হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তা এই কথাবার্তায় সুস্পষ্ট, যা তিনি অস্বীকার করেননি।”
১৪ দলের বৈঠকে ইনুর উপস্থিতি এবং কারফিউতে তার সমর্থন ছিল দাবি করে তিনি বলেন, “একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জনগণের ভাষা বুঝতে না পেরে উল্টো দমনপীড়ন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। জনগণকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করা হয়েছে।”
ট্রাইব্যুনালে নয়জন সাক্ষীর পাশাপাশি ফোনালাপের রেকর্ড, পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশন ফুটেজ দাখিল করে সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছে বলে জানান আমিনুল ইসলাম।
এদিকে ইনুর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ প্রমাণে প্রসিকিউশন ‘সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ’ হয়েছে দাবি করে ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ বলেন, “জুলাই-অগাস্টের হতাহতের ঘটনার সঙ্গে হাসানুল হক ইনুর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি ওই সময় কোনো সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক পদে ছিলেন না।”
আন্দোলনকে ‘নন-ইন্টারন্যাশনাল আর্মড কনফ্লিক্ট’ আখ্যা দিয়ে এ আইনজীবী বলেন, “সন্ত্রাসী ও জঙ্গি গোষ্ঠী ছাত্র আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল। হাসানুল হক ইনু ছাত্র-জনতার পক্ষে ছিলেন, তবে নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে ছিলেন।”
ফোনালাপের বিষয় অস্বীকার না করে তিনি বলেন, “এই কথোপকথনে তাকে অভিযুক্ত করার মতো কোনো উপাদান নেই, বরং এটিই তার প্রধান ডিফেন্স (আত্মপক্ষ সমর্থন)।
“কারণ সেখানে আন্দোলনকারীদের ঘরে ফেরার আহ্বান এবং ক্যাজুয়ালিটি বা গুলি না চালানোর কথা বলা হয়েছে।”
প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে সিফাত মাহমুদ বলেন, “পুনর্গঠিত প্রসিকিউশন টিম জুলাই-অগাস্টের ঘটনাকে ব্যবহার করে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনুসহ স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে ঘায়েল এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে মহিমান্বিত করার ষড়যন্ত্র করছে।”
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় সাতজনকে হত্যাসহ আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ইনুর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে এ মামলা করে প্রসিকিউশন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৬ অগাস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে গত বছরের ২ নভেম্বর এ মামলায় অভিযোগ গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ