টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৫ জনই রাজশাহী অঞ্চলের
টাঙ্গাইলে রড বোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ৮ জন। সবাই রাজশাহী অঞ্চলের। এরমধ্যে নওগাঁর ১২ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার দুইজন ও রাজশাহীর একজন রয়েছেন।
নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার নিহত ১০ জনের নাম ও পরিচয় শনাক্ত হওয়া গেছে। তারা সবাই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। নিহতদের মধ্যে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামেরই সাতজন রয়েছেন। এছাড়াও নিহতদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুই বাসিন্দা রয়েছেন। তারা হলেন, শিবগঞ্জ উপজেলার নজরুল ইসলাম (৫০) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আল মামুন (৩৮)। এছাড়াও রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাতানপুর এলাকার আলতাফ হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন নিহত হয়েছেন।
সোমবার (২৫ মে) বিকালে ১৫ জনের পরিবারে কাছে লাশ হস্তান্তর, সরকারের পক্ষ থেকে নিহত পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
সোমবার (২৫ মে) ভোর প্রায় সাড়ে ৪টার দিকে উত্তরবঙ্গগামী লেনে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রডবোঝাই ট্রাকটি মহাসড়কের পাশের খাদে উল্টে পড়লে হতাহতের এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় এবং পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রডবোঝাই ট্রাকটিতে যাচ্ছিলেন অনেক যাত্রী। দুর্ঘটনার সময় তাদের অধিকাংশই ছিলেন ঘুমিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, ঘুমিয়ে থাকার কারণেই হতাহতের সংখ্যা এত বেশি হয়েছে। ট্রাকটি উল্টে গেলে ট্রাক ও রডের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয় অনেকের।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এলেঙ্গা ফায়ার সার্ভিস, যমুনা সেতু পূর্ব থানা-পুলিশ ও যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ১৫ জনের মরদেহ এবং আহত অন্তত ১০ জনকে পাঠানো হয় টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে।
এদিকে উদ্ধারকাজের কারণে ভোর ৪টা ২৫ মিনিট থেকে ৫টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনে যান চলাচল সাময়িক বন্ধ ছিল। পরে সেতু পূর্ব ভূঞাপুর লিংক রোড দিয়ে ঢাকাগামী এবং পুরাতন সড়ক ব্যবহার করে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এতে বড় ধরনের যানজট সৃষ্টি হয়নি বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, চালক নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে নিহতদের মধ্য অধিকাংশই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা। নিহতদের মধ্যে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামেরই সাতজন রয়েছেন। নিহতরা হলেন, রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের তারেক জিয়া (২১), বাদশা মিয়া (৩০), আব্দুল বারিক (২০), সোহাগ হোসেন (২১), রবিউল ইসলাম (২৮) মাইনুর ইসলাম (৩০) ও সাগর হোসেন (২০), পাকুড়িয়া গ্রামের সহোদর মাইনুর রহমান (২৫) ও গিয়াস উদ্দিন (২২) এবং মশিদপুর গ্রামের সুজন আলী (৩৫)।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহতরা সবাই ফেরিওয়ালা ছিলেন। তারা সাইকেলে করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্লাস্টিকের তৈরি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতেন। পাশাপাশি নারীদের চুল ও পুরোনো মোবাইল ফোন সংগ্রহের কাজও করতেন। জীবিকার তাগিদে তারা দীর্ঘদিন ধরে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে ভাড়া বাসায় থেকে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে তারা রাজশাহীগামী একটি রডবোঝাই ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়।
একই সময়ে সাতজনের মৃত্যুর খবরে ভারশোঁ ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারি ও বুকফাটা কান্নায় পুরো এলাকা ভারী হয়ে উঠেছে। স্থানীয় লোকজনকে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে দেখা গেছে।
রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের ফিরোজ হোসেন জানান, উত্তর নাজিরপুর কলোনিতে এ এলাকার শতাধিক যুবক বছরজুড়ে হরেক পণ্যের ব্যবসা করেন। ইদের সময় বাসে বাড়ি ফিরতে জনপ্রতি ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা গুনতে হয়। অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে অনেকেই পণ্যবাহী ট্রাকে যাতায়াত করেন। নিহতরাও একইভাবে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন।
হঠাৎ দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন নিহত বাদশা মিয়ার স্ত্রী সাবিনা খাতুন। একমাত্র মেয়ে রাহী মনিকে নিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। তাকে শান্ত্বনা দিতে গিয়ে স্বজনেরাও কান্না থামাতে পারছেন না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাবিনা খাতুন বলেন, ‘বাড়ি ফেরার পথে স্বামীর সঙ্গে কয়েকবার কথা হয়েছে। মেয়ের জন্য নতুন জামা আর মেহেদী কেনার কথাও বলেছিল। রাত ১০টার দিকে শেষ কথা হয়। সকালে তার মৃত্যুর খবর পাই।’
তারেকের বাড়ি গিয়ে কথা হলো তার ফুপু খাদিজার সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘ইদের পরই তারেকের বিয়ের কথা চলছিল। কত স্বপ্ন ছিল ছেলেটার। সেই ছেলে আজ লাশ হয়ে ফিরবে।’
আজহারুল ইসলাম নামে আরেকজন জানালেন, একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু এই গ্রামে আগে কখনো হয়নি। তারা নিম্নআয়ের মানুষ এবং নিজ নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান আজহারুলের।
অন্যদিকে ভয়াবহ এই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুই বাসিন্দা। তারা হলেন শিবগঞ্জ উপজেলার নজরুল ইসলাম (৫০) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আল মামুন (৩৮)।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ নজরুল ও মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। উভয়ের পরিবারের সদস্যরা মাইক্রোবাস নিয়ে ঘটনাস্থানে রওয়ানা দিয়েছেন।
নিহত নজরুল ইসলাম শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা ইউনিয়নের দশরশিয়া স্কুলপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি মৃত সহিমুদ্দিনের ছেলে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের হকার মাল ব্যবসায়ী মো: শহিমুদ্দিন ছেলে মো: আল মামুন (৩৮)। তার দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে কোনোভাবে সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। নিহত আল মামুনের ভাই মো. হারুন জানান, পরিবারের হাল ধরতে দীর্ঘদিন ধরেই কষ্ট করে কাজ করতেন মামুন। ইদ উপলক্ষে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ হারান তিনি। তার মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। ছোট ছোট সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনরা।
আহত শেখ রতন জানান, বাসভাড়া বেশি হওয়ায় তারা জনপ্রতি ৫৫০ টাকায় রডবোঝাই ট্রাকে ওঠেন। ভোরের দিকে হঠাৎ ট্রাকটি খাদে পড়ে গেলে কয়েকজন ছিটকে পড়লেও অধিকাংশ যাত্রী রডের নিচে চাপা পড়েন।
একসঙ্গে এত শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।