শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

পদ্মার চরে আবারো গোলাগুলি, স্পিডবোট থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার

নাটোর ও বাঘা প্রতিনিধি ০৯ জুন ২০২৬ ১০:২১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নাটোর ও বাঘা প্রতিনিধি ০৯ জুন ২০২৬ ১০:২১ অপরাহ্ন
পদ্মার চরে আবারো গোলাগুলি, স্পিডবোট থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার

নাটোরের লালপুরে পদ্মার দুর্গম চরে বালু মহলের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় আজিজুল হক ঝড়ু (৩৫) নামে একজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। 


মঙ্গলবার (০৯ জুন) বিকেলে উপজেলার চরজাজিরা এলাকায় পদ্মা নদীতে ভাসমান একটি স্পিডবোট থেকে তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়।


নিহত আজিজুল হক নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাবনাপাড়া গ্রামের আব্দুল শেখ ও হাসিনা বেগম দম্পতির ছেলে। তিনি রাজশাহীর চারঘাট এলাকায় ‘কাকন গ্রুপ’ এর বালুর পয়েন্টে কাজ করতেন। 


পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে ভোরের মধ্যে যেকোনো সময় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর এবং রাজশাহীর বাঘা থানা সীমান্তবর্তী হবির চর এলাকায় বালু মহলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বেলাল গ্রুপ ও কাকন গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে আজিজুল হক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।


পরে প্রতিপক্ষের সদস্যরা তাকে একটি স্পিডবোটে করে এনে লালপুর উপজেলার চরজাজিরা মৌজার কাছে পদ্মার কিনারে ফেলে রেখে যায়। সকালে স্থানীয়রা নদীতে সবুজ ও নীল রঙের একটি স্পিডবোট ভাসতে দেখে লালপুর থানা পুলিশকে খবর দেয়।


খবর পেয়ে লালপুর থানা পুলিশ, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানা পুলিশ এবং লক্ষীকুন্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ সদস্যরা স্পিডবোটের ভেতর থেকে আজিজুল হকের লাশ উদ্ধার করেন। তার বাম চোখের উপরে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে নিহতের লাশ এবং স্পিডবোটটি জব্দ করেছে পুলিশ।


লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ  (ওসি) শফিকুল ইসলাম  বলেন, সংবাদ পেয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করি। ধারণা করা হচ্ছে, বালু মহলের আধিপত্য বিস্তারের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। লাশটি নদীর ওপর স্পিডবোটে ভাসমান অবস্থায় ছিল। যেহেতু নদীতে লাশ পাওয়া গেছে, তাই লক্ষীকুন্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ি এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।


এ বিষয়ে পদ্মার চরের গরুর রাখাল সাইদুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে স্পিডবোট নিয়ে ৬-৭ জনের সন্ত্রাসী বাহিনী এলোপাতাড়িভাবে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে চলে যায়। স্পিডবোটের সাথে ড্রোন ক্যামেরা ছিল। তারা ড্রোন ক্যামেরায় মানুষ দেখে দেখে গুড়ি ছোঁড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা বালু মহলের ম্যানেজারকে স্পিডবোটে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে ফেলে চলে যায়। পরে ঈশ্বরদীর লক্ষীকুন্ডা নৌ-পুলিশ লাশ উদ্ধার করে।


বিষয়টি নিশ্চিত করেন লক্ষীকুন্ডা নৌ-পুলিশ ইনচার্জ শাহ আলম বলেন, লাশ উদ্ধার করে লালপুর থাকায় দেওয়া হয়েছে। তারা লাশ মর্গে প্রেরণ করবে।


উল্লেখ্য, পদ্মার চর এলাকা ভারতের সীমান্ত হওয়ায় অবৈধভাবে সন্ত্রাসী বাহিনী ভারত থেকে অতি সহজে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে এসে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে বলে স্থানীয়রা জানান।  


২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর পদ্মার চরের রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সীমান্তে পদ্মার চরের নীচ খানপুরের হবিরচরের দক্ষিণে চৌদ্দহাজার মাঠে খড় কাটাকে কেন্দ্র করে গোলাগুলিতে খানপুরের মিনহাজ মন্ডলের ছেলে আমান মন্ডল, একই গ্রামের শুকুর মন্ডলের ছেলে নাজমুল হোসেন নিহত হয়। 


পরের দিন ২৮ অক্টোবর হবিরচর থেকে কুষ্টিয়ার লিটন হোসেনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনার দুই মাস পর ৩ জানুয়ারি গভীর রাতে বাড়িতে ঢুকে গুলি করে সোহেল রানাকে হত্যা করা হয়। সোহেল রানা রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের পলাশি ফতেপুর করালি নওশারার চরের কালু মন্ডলের ছেলে। 


এ ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয় তৈরি ২টি বন্দুক, ৭টি পিস্তল, ২৪ রাউন্ড কার্তুজ, ৫টি মোটরসাইকেল, মাদকদ্রব্য, ইঞ্জিনচালিত নৌকা, স্পিডবোট, অস্ত্র রাখার সিলিন্ডার, ছয়টি বড় ডেগার, ২২টি হাসুয়া, চারটি ছোরা, দুটি চাপাতি, একটি দা, একটি লোহার পাইপ, একটি টিউবওবয়েল ও একটি চকি উদ্ধার করে।


এদিকে, ১৮ মে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাসখালী চরে ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল গভীর রাতে হামলা চালিয়ে স্বপন বেপারী (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে এবং তাঁর মরদেহ ট্রলারে তুলে নিয়ে যায়। এরপর স্বপন বেপারীর ২১ দিনেও সন্ধান পায়নি পরিবার। 


এ বিষয়ে বাঘা থানার ওসি সেরাজুল হক বলেন, প্রশাসনের তালিকায় পদ্মার চরের ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম রয়েছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে কাঁকন বাহিনী, মন্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরীফ কাইগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী, সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনী। এই বাহিনী একের পর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে। তবে 'অপারেশন ফাস্ট লাইট' অভিযানে কয়েক দফায় ২০৩ জনকে গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল।