শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬
রামেক হাসপাতাল

মৃত মানুষও অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের শিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৯ জুন ২০২৬ ১১:০৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৯ জুন ২০২৬ ১১:০৪ অপরাহ্ন
মৃত মানুষও অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের শিকার

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা পারভীন বেগম। হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি মে মাসের ১৪ তারিখে দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে মারা যান। ওই রাতে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করতে যান স্বজনরা। কিন্তু ৫০ কিলোমিটারের রাস্তা ভাড়া চাওয়া হয় ৩০ হাজার টাকা। পরে ভাড়া মিটিয়ে সাড়ে ৯ হাজারে নিয়ে যাওয়া হয়।  


সরেজমিনে দেখা যায়, অ্যাম্বুলেন্সের বিশাল সিন্ডিকেট আছে। হাসপাতাল থেকে কোনো মৃতদেহ বা ছাড়পত্র পাওয়া রোগী বের হলে মৌমাছির ঝাঁকের মতো ঘিরে ধরেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা। তবে একবার যে ভাড়া বলবে সে ভাড়ায় যেতে হবে। অন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্সও নিয়ে যাবে না। এই সিন্ডিকেটও বেশ শক্তিশালী। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে চলে তারা।  


মাথায় গাছের ডাল ভেঙে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন মালেকা বেগম (৫৫)। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তির পর টানা ১৪ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে তিনি মারা যান তিনি। নিহত মালেকার বাড়ি পাবনার সুজানগর উপজেলার কালিকাপুর গ্রামে। হাসপাতাল থেকে শেষ যাত্রা, বোনকে নিয়ে ফিরতে হবে বাড়ি। তাই মর্গের সামনে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায় বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বোন রাজিয়া খাতুন। কান্নায় ভেঙে পড়ার কারণ অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া।


কান্নাজড়িত কণ্ঠে মালেকা বেগমের বোন বলেন, আইসিউতে থাকা অবস্থায় অনেক টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বাড়ি নিয়ে যাবো- সেই অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া অনেক টাকা চাচ্ছে। আমার কাছে এত টাকা নেই। আকুতি-মিনতি করেও লাভ হচ্ছে না। ৩০ হাজার টাকার নিচে কোন অ্যাম্বুলেন্স যেতে চাচ্ছে না।    


১২০০ শয্যার এই সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী মারা যান। গেল ১৫ দিনেই এখানে মারা গেছেন ৪৯০ জন। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ মানুষ বাড়ি ফিরলেও, মৃতদেহ কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের বাড়ি ফেরার একমাত্র ভরসা লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। আর এই অ্যাম্বুলেন্স ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ও বেপরোয়া সিন্ডিকেট।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রামেক হাসপাতালে  ৮ থেকে ১০ জনের একটি চক্র পুরো অ্যাম্বুলেন্স খাত নিয়ন্ত্রণ করছে। চক্রটি এতটাই প্রভাবশালী যে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে তারা। এই চক্রের মুল হোতা হিসেবে কয়েজনের নাম এসেছে। তারা হলেন, সুমন, ডালিম, বাদশা, সাদ্দাম, বিপ্লব, নিপু আরও অনেকে। এর মধ্যে সুমনের একারই রয়েছে ১১টি এবং বিপ্লব ও নিপুনের রয়েছে ৪টি করে অ্যাম্বুলেন্স। এছাড়াও সবার কয়েকটি করে অ্যাম্বুলেন্স আছে। 


হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৩৫ টাকা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের জন্য প্রতি কিলোমিটার ৩০ টাকা নির্ধারিত। কিন্তু কোনো চালকই এই নিয়ম মানছেন না। শুধু তা-ই নয়, বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতেও দেওয়া হয় না। কেউ যদি বাধ্য হয়ে বাইরের কোনো কম ভাড়ার অ্যাম্বুলেন্স আনতে যান, তবে সিন্ডিকেটের হাতে লাঞ্ছিত হতে হয়, এমনকি মারধরের শিকারও হতে হয়।


ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে কেউ মারা গেলেই দালাল ও ওয়ার্ড বয়দের মাধ্যমে দ্রুত খবর চলে যায় সিন্ডিকেটের হোতাদের কাছে। এরপরই স্বজনদের বাধ্য করা হয় তাদের সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্স নিতে। এই অর্ধশত লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার একটি বড় অংশ কমিশন হিসেবে চলে যায় চক্রটির পকেটে।


এর পাশাপাশি রয়েছে ময়নাতদন্তের নামে চাঁদাবাজি। সরকারি হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পূর্ণ ফ্রি হলেও প্রতিটি লাশের জন্য ডোমকে দিতে হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। এছাড়া ট্রলিম্যানরা রোগীকে ওয়ার্ডে নেওয়া বা অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়ার জন্যও স্বজনদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করে। এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ মানুষই নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র হওয়ায়, এমন লাগামহীন খরচে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।


তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সিন্ডিকেটের মূলহোতা হিসেবে পরিচিত সুমন ও ডালিম। তাদের দাবি, তারা কোনো সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন না। হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। 


এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা এতটাই প্রভাবশালী যে তাদের ভয়ে হাসপাতালে উপ-পরিচালক ডা. হাসানুল হাসিব কথা বলতে রাজি হননি। 


রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বলেন, হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিষয়টি সমাধানের জন্য ইতোমধ্যেই ট্রাফিক বিভাগকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অচিরেই এই সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।