কুরিয়ার সার্ভিসের গাফিলতি, আম পাঠানোর বিড়ম্বনা
স্বাদে অনন্য হওয়ায় রাজশাহী অঞ্চলের আমের খ্যাতি সারা দেশে। স্থানীয় বাজার ছাড়াও অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে এসব আম। ক্রেতাদের ঘরে সেসব আম পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম এখন কুরিয়ার সার্ভিস। আমের ব্যবসা ঘিরে এই কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসাও কয়েক কোটি টাকার। তবে কুরিয়ার সার্ভিসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠছে। সময়মতো ক্রেতার কাছে আম না পৌছানে, কেজিতে কম অথবা কার্টন বা ক্যারেট ছিঁড়ে আম বের করে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনলাইনে আম বিক্রিতে উত্থান হয়েছে শত শত উদ্যোক্তার। এছাড়াও খুচরা বিক্রেতাও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আমের অর্ডার নেওয়া হচ্ছে। সরাসরি বাগান থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও জেলায় এই আম পৌছে যাচ্ছে। যাওয়ার পর অনেক ক্রেতা অভিযোগ করেন আম ওজনে কম অথবা কার্টন ছেড়া। এতে বিড়ম্বনায় পড়ছেন উদ্যোক্তারা।
রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ-নওগাঁ ব্যতীত আমের বাগানের এমন বিস্তার দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে নেই। আড়াইশোর বেশি জাতের সুমিষ্ট আমের ৯৫ ভাগই এ অঞ্চলে উৎপাদিত হয়। মৌসুমে ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি আমের বেচাকেনা হয় এ অঞ্চলে। তবে গেল বছর থেকে দাম কম থাকায় লোকসান গুনছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
অনলাইনে যারা আমের ব্যবসা করেন তাদের ভরসা বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস। এর মধ্যে কিছু কুরিয়ার সার্ভিস আম যাওয়ার টাকা শোধ করার সুযোগ রেখেছে। তবে এসব কুরিয়ারের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্ভোগের অভিযোগ উঠছে। সেবা নিয়ে গাফিলতি, প্রতিশ্রুতির বরখেলাপসহ নানা কারণে কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে আম ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি-উদ্যোক্তারা। প্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতিতে ক্ষুণ্ন হচ্ছে রাজশাহীর আমের সুনাম। লাখ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে এ অঞ্চলের ই-কমার্স উদ্যোক্তারা। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সামান্য বলে দাবি কুরিয়ার প্রতিনিধিদের।
গেল বছরগুলোয় আমের ক্রেতা তালিকায় নতুন নাম হয়ে উঠেছেন ই-কমার্স উদ্যোক্তারা। তারা বাগান বা হাট থেকে উন্নত আম খুঁজে ভোক্তার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন। চাহিদা বাড়ায় বাড়ছে উদ্যোক্তার সংখ্যাও। আম পরিবহনে এই উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় কুরিয়ার সার্ভিসের। তবে এই নির্ভরশীলতায় দিন দিন বাড়ছে কুরিয়ারগুলোর একচেটিয়া মনোভাব।
ঢাকা থেকে রাজশাহীতে আম কিনতে এসেছেন ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন। তিনি সরাসরি বাগন থেকে আম কিনেন। তিনি বলেন, আমি ঢাকা থেকে নিতে এসেছি। আমার আসা-যাওয়া বাসে। কিন্তু যে আম কেনা হয়েছে তা কুরিয়ারে পাঠাতে হবে। অল্প আম কিনেছি। না হলে ছোট ট্রাক ভাড়া নিতাম। কিন্তু কুরিয়ারে দিয়ে শান্তি পাওয়া যায় না। তারা পাঠাতে সময় লাগিয়ে দেয়। সাধারণত আজ পাঠালে কাল সকালের মধ্যে পাওয়ার কথা। কিন্তু দুইদিন সময় লেগে যায়। এতে আমও নষ্ট হয়ে যায়। তখন বিক্রি করতে পারি না।
উদ্যোক্তা আশফাকুজ্জামান সিফাত বলেন, গেল বছরে আম পাঠানোতে আমার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ২০ কেজি আম পাঠালে ১৬ থেকে ১৭ কেজি আম পেয়েছে ক্রেতা। প্যাকেট ছিঁড়ে আম বের করে নেওয়া হয়েছে। কিছু ক্রেতা এমন অভিযোগও করেছে। কুরিয়ার সার্ভিসে যোগাযোগ করলে তারা কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এবছরও একই ঘটনা ঘটছে। তবে আম প্যাক করার সময়ে ছবি ও ভিডিও কাস্টমারের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারা চেক করে নিচ্ছেন।
আরেক উদ্যোক্তা তামিম আহমেদ বলেন, সিলেট থেকে ১০ মণ আমের অর্ডার এসেছিল এবার। গাছ থেকে আম সংগ্রহ করে কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠানোও হয়েছে। কিন্তু ক্রেতারা এক সপ্তাহেও আম পাইনি। কুরিয়ার সার্ভিসে যোগাযোগ করা হলে তারা বলছেন আম পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু ক্রেতারা সেখানে যোগাযোগ করেও আম পাচ্ছে না। এতদিন আম ভালো থাকার কথা না। এতে লোকসান আমারই হচ্ছে।
নগরীর শিরোইল এলাকার আম বিক্রেতা রুবেল হোসেন বলেন, আমাদের এখান থেকে ক্রেতারা সরাসরি অথবা অর্ডার দিয়ে আম নিচ্ছেন। আমরা সাধ্য মতো আম পাঠিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু সময়মতো আম পৌছাতে পারছে না। এতে ক্রেতাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। ক্রেতার কাছে যেতে ঢাকার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা, ঢাকার বাইরে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই যথেষ্ট। তারা তিনদিন, চারদিন, পাঁচদিনেও পাঠাতে পারছে না।
বিক্রেতারা বলছেন, যেসব কুরিয়ার আছে তারা প্রতিনিয়ত আমাদের মতো অনলাইন প্লাটফর্মের লোকগুলোকে হ্যারাজমেন্ট করছে। তারা দেখা যায় যে, কমিটমেন্ট তো নষ্ট করেই, তারপরও আমরা যে টাকার বিনিময়ে পণ্য পাঠাই। তারা ক্ষতিপূরণ দেয় না। এতে পুরোটা আমাদের লস হচ্ছে।
একটি কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতি বছরে আমের বড় চালান পাঠানো হয়। এই শাখা থেকে চার হাজার ক্যারেট পণ্য পাঠিয়েছি। প্রতি বছর কয়েক হাজার মণ আম পাঠানো হয়। এক গাড়ি আগে যাচ্ছে, আরেক গাড়ি পরে গেছে। সব আম যে নষ্ট হয়েছে তা কিন্তু না। যদি কারও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় বা কোনো পার্সেলে ক্ষতি হয়- তাহলে সেটা আমাদের দিলে আমরা আগে সেটা ভেরিফাই করছি। আম চুরিরও ঘটনা ঘটছে না।
এ অঞ্চলের জি-আই পণ্য আমের সুনাম ও বাজার টিকিয়ে রাখতে আম পরিবহনে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি বাগানিদের। এদিকে ভোক্তা অধিকার বলছে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবেন তারা। রাজশাহী বিভাগের জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, যদি কোনো ভোক্তা বা ক্রেতা তার অর্ডার করা পণ্য যথাযথভাবে না পান তাহলে এটা আমাদের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। এটা একদম সহজ, সরাসরি অভিযোগ করতে পারবেন অনলাইনে।