শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় অতিষ্ঠ জনজীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৭ জুন ২০২৬ ১১:৩১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৭ জুন ২০২৬ ১১:৩১ অপরাহ্ন
বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় অতিষ্ঠ জনজীবন

দুই মাসের ব্যবধানে রাজশাহীতে আবারও শুরু হয়েছে বিদ্যুতের আসা যাওয়ার খেলা। ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিঙের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির পর ঘন ঘন লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে ৩৫ শতাংশ লোডশেডিঙের তথ্য জানানো হলেও মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। দিনে অর্ধেক সময়ও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহক।


মহানগর ও উপজেলায় এলাকায় ১ ঘণ্টা পর বিদ্যুতের দেখা মিললেও গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খুবই করুণ। সেখানে দিনে রাতে গড়ে ৬ ঘণ্টাও মিলছে না বিদ্যুৎ। এতে গ্রামীণ জীবনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না পাওয়ায় খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ফুটবল প্রেমীরা। ফলে জনমনে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে তীব্র সমালোচনা।


গরমের তীব্রতা ও লোডশেডিঙে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থরা পড়েছেন বিপাকে। তীব্র গরমে অতিরিক্ত ঘেমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তাদের অনেকেই। অফিস-আদালতে কাজে নেমে এসেছে স্থবিরতা। একইসাথে ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে মন্দাভাব।


লোডশেডিঙে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ীরাও। তারা বলছেন, রাত ৯টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দোকানপাট। এরমধ্যে দিনভর ভয়াবহ লোডশেডিঙে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দার কারণে লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।


বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে দেশে হঠাৎ বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বৃদ্ধি না হওয়ায় লোডশেডিং বাড়ছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতির উত্তরণ হবে সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট কারও কাছে নেই। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় লোডশেডিঙের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে বলে জানান তারা।


গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পেলেও লোডশেডিং কমেনি বরং পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম এবং দৈনন্দিন জীবনে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রাজশাহীতেও লোডশেডিং বেড়েছে।


নগরীর সাহেববাজারের কাপড় ব্যবসায়ী শাহজামাল আলী বলেন, সকাল ১০টায় দোকান খোলা হয়েছে। সাড়ে ১০টায় বিদ্যুৎ গেছে। এসেছে এক ঘণ্টা পর। আবার এত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থেকে সাড়ে ১২টার দিকে চলে গেছে। এতে ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে। ক্রেতাদের ঠিকমত কাপড় দেখানো যাচ্ছে না। 


রাজশাহী নগরীর নিউমার্কেট এলাকার রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী জোবায়ের হোসেন বলেন, রাত ৯টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে। সকাল খুলতে খুলতে ১১টা বেজে যায়। ক্রেতারা আসেন দুপুর থেকে। এরমধ্যে সারাদিনের অর্ধেক সময়ও বিদ্যুৎ থাকে না। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করা ছাড়া কোন উপায় নেই।


এদিকে গ্রাহকদের অভিযোগ, বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লেও বিল অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকের দাবি, গত মাসে যেখানে তাদের বিল ছিল প্রায় ৩ হাজার টাকা, সেখানে চলতি মাসে তা বেড়ে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। একইভাবে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকার বিল এখন ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।


গ্রাহকদের ভাষ্য, ঘন ঘন লোডশেডিঙের কারণে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ ব্যবহার কম হওয়ার কথা। অথচ বাস্তবে বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করে অতিরিক্ত বিল আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন তারা।


প্রিপেইড মিটারের বিভিন্ন চার্জ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন গ্রাহকরা। তাদের প্রশ্ন, নিজস্ব অর্থে মিটার কেনার পরও কেন মিটার চার্জ দিতে হবে। পাশাপাশি ‘ডিমান্ড চার্জ’ নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।


গ্রাহকদের দাবি, ৫০ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের জন্য সহনীয় ও অভিন্ন মূল্যহার নির্ধারণ করা হোক। অন্যথায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। তাদের আশঙ্কা, বিদ্যুৎ বিলের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে জনঅসন্তোষ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।


নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি থেকে জানানো হয়, বুধবার (১৭ জুন) রাজশাহী মহানগরীতে ১৫১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ১১১ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ৪০ মেগাওয়াট। 


নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী জিয়াউল ইসলাম বলেন, আমাদের যতটুকু বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে আমরা ঠিক ততটুকু সরবরাহ করছি। জাতীয় গ্রিড থেকে বেশি বিদ্যুৎ আসছে না। আমরা পেলে গ্রাহকের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করবো।  


তিনি আরও বলেন, গরম বাড়ায় চাহিদা বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বাড়েনি। ফলে সরবরাহ কম থাকায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আপাতত এ অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা নেই। কারণ জাতীয়ভাবে উৎপাদন না বাড়লে লোডশেডিং কমার সম্ভাবনা নেই। তবে আগামী শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি হওয়ায় চাহিদা কমবে। এতে লোডশেডিঙের পরিমাণও কমবে।