শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

প্রক্টরের সামনে সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের ওপর হামলা মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের

রাবি প্রতিবেদক ১৯ জুন ২০২৬ ১১:০০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
রাবি প্রতিবেদক ১৯ জুন ২০২৬ ১১:০০ অপরাহ্ন
প্রক্টরের সামনে সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের ওপর হামলা মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের

র‌্যাগিংয়ের ভিডিও ধারণ করায় প্রক্টর ও বিভাগের সভাপতির উপস্থিতিতে ৩ সাংবাদিক ও রাকসুর (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) সহ-সাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) দুই নেতাকে মারধর করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসের রবীন্দ্র ভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। 


মারধরের শিকার হয়েছেন রাবি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের রাবি প্রতিনিধি মারুফ হোসেন মিশন, ঢাকা পোস্টের রাবি প্রতিনিধি জুবায়ের জিসান, দৈনিক মানবকণ্ঠের রাবি প্রতিনিধি আবু বকর অনিক। এছাড়া রাকসু এজিএস সালমান সাব্বির ও রাকসু বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্করও মারধরের শিকার হন। 


অভিযুক্তরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল, ওমি,  আহমেদ রিয়াদ, ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী সামি, ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী জিহাদ ও আতিক এবং ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী সামিরসহ ৮-১০ জন শিক্ষার্থী।


প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মার্কেটিং বিভাগের তিনজন জুনিয়র শিক্ষার্থী এক সাংবাদিককে মেসেঞ্জারে জানায় যে, ওই বিভাগের সিনিয়ররা তাদের সাথে মিট-আপের নামে দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখে এবং র‌্যাগ দেয়। বৃহস্পতিবারই রবীন্দ্র ভবনের পাশের সাইকেল গ্যারেজে তাদের সাথে বসবে বলে জানায় এবং প্রক্টরকে নিয়ে যেতে বলে তারা। পরে সাংবাদিক ও সহকারী প্রক্টর সেখানে যান এবং দেখেন জুনিয়র শিক্ষার্থীদের ৫টি সারিতে দাঁড় করিয়ে রেখেছে ইমিডিয়েট সিনিয়র শিক্ষার্থীরা। 


এ ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন সাংবাদিক মিশন। পরে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ভিডিওতে র‌্যাগিংয়ের কথা অস্বীকার করেন। তারপরই সাংবাদিকের উপর ক্ষিপ্ত হন সিনিয়র শিক্ষার্থীরা এবং তাকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা ও গালাগালি করে। জুনিয়ররা বলেন, ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম নিয়ে তাদের এখানে ডেকেছেন সিনিয়ররা। কিন্তু এভাবে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানোর কারণ জানতে চাইলে কোনো উত্তর দিতে পারেনি তারা। এদিকে সিনিয়রদের দাবি, খেলা নিয়ে আলোচনা করছিলেন তারা।


সাংবাদিককে ভিডিও ডিলিট করতে বারবার চাপ দিতে থাকে অভিযুক্ত ও কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী। কিন্তু সাংবাদিক ভিডিও ডিলিট করতে রাজি না হওয়ায় দফায় দফায় তাকে তেড়ে মারতে আসেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। 


এক পর্যায়ে সেখানে আর কয়েকজন সাংবাদিক উপস্থিত হন। তাদেরকে আটকে রাখা হয় এবং অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা হয়। এসময় অভিযুক্তরা নানা রকম হুমকি দিতে থাকে। মামলা করার ভয়ও দেখান তারা। এরপর সেখানে আসেন রাকসু এজিএস সালমান সাব্বির ও রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর। ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন তারা। তবে চেষ্টা করলেও কেউ তাদের কথা শুনতে চাননি। উল্টো ওই বিভাগের শিক্ষার্থীরা আরও ক্ষিপ্ত হন।


পরবর্তীতে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর সেখানে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান এবং মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক বোরাক আলী ও সাবেক সভাপতি ড. নুরুজ্জামান। তারা আসার পর বিষয়টি মিটমাট করার চেষ্টা করেন। দুপক্ষের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত হয় প্রক্টর অফিসে বসে সমাধান করা হবে। তবে সেখান থেকে কাউকে যেতে দিচ্ছিল না মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা। 


পরবর্তীতে প্রক্টর অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সবাই ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় হঠাৎ করেই আরেক সাংবাদিক আবু বকর অনিককে “আমাদের স্যারের সামনে হাঁটছিস?” বলেই মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল মুখে থাপ্পড় ও পেটে লাথি মারে। তারপর সামি (২০২৪-২৫), ওমি (২০২২-২৩), আহমেদ রিয়াদ (২০২২-২৩), জিহাদ (২০১৯-২০), আতিক (২০১৯-২০) ও ২০২৩-২৪ সেশনের সামির এলোপাতাড়ি কিল-ঘুসি মারতে থাকে। তখন আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী ঝাঁপিয়ে পড়ে গোল হয়ে সাংবাদিকদের চড়-কিল-ঘুসি ও লাথি মারতে থাকে।


একই সময়ে সাংবাদিক মিশনের মুখে কয়েকটি থাপ্পড় মারে, সাংবাদিক জুবায়ের জিসানকে মাথায় ও পিঠে ঘুসি ও লাথি মারে এবং রাকসুর এজিএস ও বিতর্ক সম্পাদককে গালিগালাজ ও মারধর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান দুজনকে তাঁর গাড়িতে তুলে দেন এবং সেখান থেকে উদ্ধার করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে আসেন। 


চলে আসার সময়েও মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেয় এবং বারবার জোরে জোরে বলতে থাকে, “গধৎশবঃরহম রং ধ নৎধহফ. ঞযরং রং সধৎশবঃরহম, একদম মেরে সোজা করে ফেলবো”। সাংবাদিক মিশনকে উদ্দেশ্য করে ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান জিহাদ হুমকি দিয়ে বলেন, “ওরে ভালো মুখে বলেছিলাম ভিডিওটা ডিলিট করতে। ও শুনল না। পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগে ওর অবস্থা খারাপ করে ছাড়ব।”


এ বিষয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিক মারুফ হোসেন মিশন বলেন, আমি র‌্যাগিংয়ের খবর পেয়ে প্রক্টর স্যারকে কল করে জানাই। কিছুক্ষণ পরে একজন সহকারী প্রক্টর স্যার ঘটনাস্থলে চলে আসে এবং আমিও তাঁর পিছু পিছু যাই। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আমি ভিডিও ধারণ করি। সেখানে সারিবদ্ধভাবে জুনিয়রদের দাঁড় করিয়ে র‌্যাগ দিচ্ছিল সিনিয়ররা। আমাকে ভিডিও ডিলিট করতে চাপ দেয় ও গালাগালি করতে থাকে এবং ডিলিট করতে রাজি না হওয়ায় তেড়ে মারতে আসে কয়েকবার। এক পর্যায়ে আমাকে ও আমার ক্লাবের দুই সাংবাদিককে এবং রাকসুর এজিএস ও বিতর্ক সম্পাদককে চড়-কিল-ঘুসি মারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এক পর্যায়ে প্রক্টর তার নিজের গাড়িতে করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যান। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।


এ বিষয়ে জানতে কল দিলে মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাবিবুর রহমান হিমেল বলেন, এটা আপনি ভুল তথ্য পেয়েছেন। একটা জটলা হয়েছিল, কথা-কাটাকাটি হয়েছে জাস্ট। সেখানে কোনো মারামারির ঘটনা ঘটেনি। 


তবে একই বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী মাহির বলেন, মারধরের ঘটনা ঘটেছে। তবে আমি মারধর করিনি। 


এ বিষয়ে রাকসুর বিতর্ক ও সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক ইমরান লস্কর বলেন, ওখানে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। আমি থামাতে গেলে আমার ওপরও আঘাত আসে। আমরা রাকসুর পক্ষ থেকে প্রশাসন কাছে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি জানাই। এ বিষয়ে মার্কেটিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এম বোরাক আলী বলেন, আমি, প্রক্টর, সহকারী প্রক্টররা ঘটনাস্থলে ছিলাম। এরপরও একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। আমরা তখনই দুই পক্ষকেই বোঝানোর এবং থামানোর চেষ্টা করেছি। আমরা বিষয়টার মীমাংসার চেষ্টা করছি।


মারধরের বিষয়ে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক জহুরুল ইসলাম বলেন, মারধরের অধিকার তাদেরকে কেউ দিইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ কাউকে মারতে পারে না। এটা তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভঙ্গ করেছে। অবশ্যই তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। 


বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, আমি নিজে সেখানে ছিলাম। সাংবাদিকদের যে ঘটনাটা হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। প্রক্টর, সরকারি প্রক্টর এবং তার বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে আমরা সমাধান করার চেষ্টা করেছি। এছাড়া ভিসি স্যার নিজে তার বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছে। তারপরও এরকম একটা ঘটনা আমাদের মধ্যে সংশয় জাগায়। আমি মনে করি, এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু বিচারতো অবশ্যই করা দরকার এবং যারা দোষী তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। আমি বিশ্বাস করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটা করবে।


র‌্যাগিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের যেভাবে আমরা পেয়েছি তা র‌্যাগিংয়ের সকল সিম্পটম আছে। 


সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের মারধরের ঘটনায় তিনি বলেন, আমার সামনে সাংবাদিক ও রাকসুর নেতাদের মারধর করা হয়েছে। এটা খুবই জঘন্যতম অন্যায় হয়েছে। এটার বিষয়ে দোষীদের শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।