শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

মাদ্রাসার জমি-অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত চেয়ে ইউএনওকে স্মারকলিপি

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২৩ জুন ২০২৬ ১২:৪৮ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক: ২৩ জুন ২০২৬ ১২:৪৮ অপরাহ্ন
মাদ্রাসার জমি-অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত চেয়ে ইউএনওকে স্মারকলিপি

রাজশাহীর পবা উপজেলার খোলাবোনা দাখিল মাদ্রাসা ও খোলাবোনা ফুরকানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার জমি, অর্থ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এ দাবিতে মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনুল আবেদীনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। পরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে খোলাবোনা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মিকাইল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করেন তাঁরা।

স্মারকলিপি দেওয়ার সময় জাহিদুল ইসলাম, আব্দুস সালাম ও কাজিম উদ্দিনসহ খোলাবোনা গ্রামের প্রায় ১০০ বাসিন্দা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দাতা পরিবারের সদস্য, সাবেক শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা দুই মাদ্রাসার জমি ও অর্থের হিসাব প্রকাশ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রতিষ্ঠান দুটিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে স্লোগান দেন।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, হরিপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক, আর্থিক ও সম্পত্তিসংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে খোলাবোনা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মিকাইল হোসেন, কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দোসরসহ পরিচালনা কমিটির কয়েকজন সদস্য প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

দাতা পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা প্রতিষ্ঠান দুটির উন্নয়নে ১০৫ বিঘা জমি দান করেছিলেন। তবে এসব সম্পত্তির বর্তমান অবস্থা, দখল, বার্ষিক আয় ও ব্যয়ের পরিষ্কার হিসাব এলাকাবাসীকে জানানো হয়নি। কিছু জমি বিক্রি ও বিনিময় এবং শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। স্মারকলিপিতে সম্প্রতি গভীর রাতে মাদ্রাসার অফিস খুলে কম্পিউটার থেকে নথিপত্রের অনুলিপি তৈরি এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি সরিয়ে নেওয়া বা পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠান দুটির সম্পত্তির বার্ষিক আয়ের ৪০ শতাংশ ফুরকানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা এবং ৬০ শতাংশ দাখিল মাদ্রাসার জন্য ব্যবহারে সালিস বৈঠকে দেওয়া প্রস্তাব কার্যকর করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। স্মারকলিপিতে দুই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক, আর্থিক ও সম্পত্তিসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই; জমি ও অর্থের হিসাব সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নিরীক্ষা; অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সুশাসন ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

প্রতিবাদ মিছিল শেষে এলাকাবাসীর পক্ষে জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে এখানে আসিনি। প্রতিষ্ঠানের নামে কত জমি রয়েছে, সেগুলো বর্তমানে কার দখলে এবং সেখান থেকে পাওয়া অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাই। সরকারি রেকর্ড ও মাদ্রাসার নথি মিলিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।”

আব্দুস সালাম বলেন, “দাতা পরিবারের সদস্যরা শিক্ষার উন্নয়নের জন্য জমি দিয়েছিলেন, ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করার জন্য নয়। অথচ সেই সম্পত্তি থেকে প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছে না বলে আমরা মনে করছি। জমি বিক্রি, বিনিময় ও নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। আমরা চাই, মাদ্রাসার সম্পদ উদ্ধার করে তা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যবহার করা হোক।”

কাজিম উদ্দিন বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর বিভিন্ন প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং জমিসংক্রান্ত নথি জনসমক্ষে প্রকাশ করলে অনেক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যাবে। আমাদের আন্দোলন কোনো ব্যক্তিকে অপমান বা হয়রানি করার জন্য নয়; আমরা সত্য উদ্‌ঘাটন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার জন্য এসেছি। প্রশাসন ব্যবস্থা না নিলে এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে আইনসম্মতভাবে পরবর্তী কর্মসূচি দেওয়া হবে।”

হরিপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. বারশেদ আলী বলেন, দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে তাঁরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। প্রশাসনিক উদ্যোগে সমাধান না হলে আদালত বা ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।

এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, “এলাকাবাসীর দেওয়া স্মারকলিপি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে উত্থাপিত অভিযোগ ও দাবিগুলো যাচাই করে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার পাশাপাশি উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হবে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

অভিযোগ অস্বীকার করে সুপার মিকাইল হোসেন বলেন, “আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সঠিক নয় এবং আমি প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পত্তি আত্মসাৎ করিনি। মাদ্রাসার সব কার্যক্রম পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত ও প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করব। তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য প্রকাশিত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”