নাটোরে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জাতের আঙুর চাষ
এক সময় বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আঙুর চাষ প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হলেও বর্তমানে নাটোরে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জাতের আঙুর চাষ করে সফলতা অর্জন করছেন একাধিক কৃষি উদ্যোক্তা। উন্নত প্রযুক্তি, পলিনেট হাউজ ও আধুনিক পরিচর্যা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশি বিভিন্ন জাতের আঙুর উৎপাদন করে তারা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ সৃষ্টি করেছেন।
সাদা, কালো, সবুজ, লাল ও বেগুনি, রঙয়ের পলিনেট হাউসের ভেতর মাচায় ঝুলে আছে থোকা থোকা সুমিষ্ট আঙুর ফল। আর সবুজ পাতার মাঝে উঁকি দিচ্ছে কোথাও লাল, আবার কোথাও হলুদ-সবুজ রঙের মিশ্রণের এসব আঙুর ফল। খেতে কোনটা মিষ্টি আবার কোনটা হালকা টক-মিষ্টি। এসব আঙ্গুর দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও বেশ সুমিষ্ট। আর আঙুর ফলের এ বাগান দেখলে যে কারোরই মনে হবে এযেন বিদেশের মাটিতে চাষাবাদের কোন আঙুর ক্ষেত।
আসলে এটি তা নয়, দেশের মাটিতেই উত্তরের জেলা নাটোরে এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে, বিদেশি জাতের নানা আঙুর ফল, সৃষ্টি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। আগে মানুষের ধারণা ছিল আঙর একটি বিদেশি ফল, এ দেশে চাষ করলে হয় টক। কিন্তু সেই ধারণা পাল্টে দিয়ে মিষ্টি আঙুর ফল চাষাবাদ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নাটোরের বাগরুম গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আমজাদ হোসেন।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও আঙুর বাগান চাষী সুত্রে জানা যায়, নাটোর সদর উপজেলার হালসা ইউনিয়নের বাগরুম গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন। তারা দশ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট আমজাদ। পড়া লেখায় সে মাধ্যমিক গন্ডি পার হতে না পারলেও ইউটিউব আর ফেসবুক দেখে ২০১৮ সালে শখের বশে মাত্র ৫শতক জায়গায় আঙুর চাষ শুরু করে। পরে বাণিজ্যিকভাবে এর সম্প্রসারণ ঘটান। তার বাগান থেকে ফল বিক্রির পাশাপাশি আঙুরের কাটিং চারা বিক্রি করেও উল্লেখযোগ্য আয় হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিনি লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন বলে জানা গেছে।
বর্তমানে শহরতলির কান্দিভিটা এলাকায় দেড় বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে রাশিয়ান বাইকুনুরসহ সাতটি জাতের আঙুর ফল চাষাবাদ করে সফল হয়েছেন তিনি। তার বাগানে গেলেই দেখা মিলবে মাচায় ঝুলে আছে থোকা থোকা টসটসে আঙুর ফল। প্রতিদিন বাগানটি এক নজর দেখার জন্য দুরদুরান্ত থেকে আসেন দর্শনার্থীরা আবার বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি পেশার অনেক ক্রেতাও আসেন আঙুর ফল ও চারা কিনতে।
নাটোর পুলিশ লাইন্স স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া সোমা দিঘীর মতে, শহরের প্রাণ কেন্দ্রে এমন আঙুর বাগান, মনে হচ্ছে বিদেশের কোন মাটিতে এ বাগান। না দেখলে বিশ্বাস হবে না যে বিদেশী ফল আমাদের দেশের মাটিকে তাও আবার নাটোর শহরে ।
আঙুর বাগানে ঘুরতে আসা এক দর্শনার্থী বলেন, আমি নাটোরে এই প্রথম দেখলাম আঙুর বাগান, বাগানটি দেখে অনেক ভালো লাগলো । তিনি সৌদি আভায় একটি মসজিদে ইমামতি করেন, তার মতে, সৌদিতে যে আঙুর বাগান রয়েছে তা অনেক ছোট ছোট আর এটা অনেক বড় দেখতে অনেক সুন্দর এবং আঙুর গুলো সুমিষ্টি।
রাজশাহী থেকে আসা আল আমীন নামে এক যুবক তিনি বলেন, ফেসবুকে দেখে বাগানে আসা মূলত তিনি এমন একটা বাগান করতে আগ্রহী। তাই পরিবারসহ এসেছেন কিছ বাইকুনুর জাতের চারা কিনতে যেটা লাল হয় ।
আমজাদ হোসেন বলেন, প্রথম অবস্থায় দেখে মনে হয় কঠিন । আসলে বাড়ির আঙিনায় যে লাউ-কুমড়া চাষ করি একই ভাবে জৈবসার দিয়ে গাছ গুলো তৈরি করতে হয়।
তরুণ উদ্যোক্তা আমজাদ হোসেনের মতে, রাশিয়ান, চায়না, অস্ট্রেলিয়ান ও অন্যান্য উন্নত জাতের আঙ্গুর চাষ করছেন। এসব বাগানে উৎপাদিত আঙুর স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও আকৃষ্ট করছে। কৃষকদের দাবি, সঠিক পরিচর্যা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দেশের মাটিতেও মানসম্মত আঙুর উৎপাদন সম্ভব।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতদরের উপ-পরিচালক হাবীবুল ইসলাম খান বলেন, নাটোরের মাটি ও আবহাওয়া আধুনিক ব্যবস্থাপনায় আঙুর চাষের জন্য উপযোগী হয়ে উঠছে। ফলে জেলার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এর মধ্যে তরুণ উদ্যোক্তা আমজাদ হোসেন, তিনি নিজ উদ্যেগে কিছু আঙুর চাষ শুরু করেছেন। আমরা রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পর আওতায় দুটি পলিনেট দেওয়া হয়েছে। তার একটি জায়গা নিজস্ব অন্যটি ২৫ শতক ভারা নেয়া। নাটোরে পলিনেট হাউজ ও ছাদ বাগানে আঙুর চাষ হচ্ছে। এই আঙুরগুলো মিষ্টটতা পরীক্ষা করেছি যা বাজারের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।
তবে চাষের খরচ কমানো, প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং বাজারজাতকরণ সহজ করা গেলে এ খাত আরও সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মনোবল, উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা থাকলে দেশের মাটিতে বিদেশি ফল চাষাবাদ করে স্থানীয় চাহিদা মেটানোসহ আর্থিকভাবে উন্নয়ন করা সম্ভব।
এর পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই আঙুর উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করার অপার সম্ভাবনা রয়েছে।