শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই হবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সুগম পথ

বগুড়া:প্রতিনিধি ২৭ জুন ২০২৬ ১২:৩২ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
বগুড়া:প্রতিনিধি ২৭ জুন ২০২৬ ১২:৩২ অপরাহ্ন
আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই হবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সুগম পথ

‘আবর্জনা’ বা বর্জ্য নাগরিক জীবনের এক বড় মাথা ব্যথার কারণ, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পরিণত হতে পারে মূল্যবান সম্পদে। বিশ্বজুড়ে আজ বর্জ্যকে শুধু ফেলে দেওয়ার জিনিস হিসেবে দেখা হয় না, বরং একে বিবেচনা করা হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশ সুরক্ষার এক দারুণ হাতিয়ার হিসেবে। ‘বর্জ্যই সম্পদ’ এই ধারণাকে পুঁজি করে গড়ে উঠছে সার্কুলার ইকোনমি বা চক্রাকার অর্থনীতি, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রবিন্দু বগুড়া। এ শহরটি সম্প্রতি পৌরসভার খোলশ পরিবর্তন করে মহানগর নামধারণ করেছে। এ নগরে যেমন বাড়ছে জনসংখ্যা, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্জ্যের পরিমাণ। বর্তমানে প্রতিদিন মহানগর এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ি, কাঁচাবাজার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০ থেকে ৩০০ মেট্রিক টন বর্জ্য বের হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ এই বর্জ্য শহরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সঠিক ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই প্রকট সমস্যাকে এক বিরাট অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিদিন জমা হওয়া ২০০ থেকে ৩০০ মেট্রিক টন বর্জ্যের সিংহভাগই পচনশীল জৈব বর্জ্য। এই বর্জ্যকে যত্রতত্র ফেলে না রেখে যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করা যায়, তবে তা স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। 

সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রান্সফার স্টেশনগুলোর কয়েকটিতে শেড থাকলেও কয়েকটি উন্মুক্ত। মোবাইল ডাস্টবিনে করে সিবিও শ্রমিকরা আবর্জনা নিয়ে এসে স্টেশনের সামনে ফেলছেন। এগুলো বেশিরভাগ রাস্তার ওপর গিয়ে পড়ে। আবার কাক, কুকুর ও কিছু ছিন্নমূল মানুষ এসব আবর্জনা ঘাঁটাঘাঁটি করে রাস্তার অর্ধেক পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়। ফলে পুরো ট্রান্সফার স্টেশন এলাকাজুড়ে দুর্গন্ধ ভেসে বেড়ায়। এতে আশপাশের বাসিন্দা ও পথচারীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।

বগুড়া একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল। আমাদের মোট বর্জ্যের একটি বিশাল অংশই পচনশীল জৈব বর্জ্য। তাই এগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমানের জৈব সার বা ‘কম্পোস্ট’ তৈরি করা সম্ভব। এতে করে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এই জৈব সার কৃষিতে ব্যবহার করলে একদিকে যেমন মাটির উর্বরতা বাড়বে, অন্যদিকে সার আমদানির পেছনে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

আর অ-পচনশীল বর্জ্য এবং প্লাস্টিক থেকে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়োগ্যাস, তরল জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এটি শহরের জ্বালানি চাহিদার একটি অংশ পূরণ করতে পারে। বর্জ্য পুড়িয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা অনেক সহজ হবে। প্লাস্টিক, কাচ, কাগজ এবং মেটাল বা ধাতব বর্জ্য রিসাইকেল করে নতুন পণ্য তৈরি করা এখন বিশ্বজুড়ে অন্যতম লাভজনক ব্যবসা। বিশেষ করে প্লাস্টিক রিসাইক্লিং শিল্প বাংলাদেশে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এবং কাঁচামাল আমদানির খরচ কমিয়ে দিতে পারে। 

এদিকে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন প্রতিদিন তাদের বিভিন্ন গার্বেজ ট্রাক ও ভ্যানের মাধ্যমে প্রায় ১০০ থেকে ১৬০ মেট্রিকটন বর্জ্য অপসারণ করতে পারে, যা শহরের অস্থায়ী বিভিন্ন ট্রান্সফার স্টেশন ও ভাগাড়ে নিয়ে ফেলা হয়। বাকি বর্জ্যের একটি বড় অংশ শহরের বিভিন্ন ড্রেন, খাল কিংবা উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকে।

বগুড়াকে একটি পরিচ্ছন্ন ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে একটি সমন্বিত ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন উৎসস্তরে বর্জ্য পৃথকীকরণ করতে হবে। প্রতিটি বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের সময়ই পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করার জন্য নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এর জন্য ভিন্ন রঙের ডাস্টবিন ব্যবহার করা যেতে পারে।

সিটি কর্পোরেশন একা এত বিশাল পরিমাণ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করতে না পারলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এর মাধ্যমে বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে পারে। এতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এছাড়াও শহরের বাইরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ‘ওয়েস্ট-টু-এনার্জি’ (বর্জ্য থেকে শক্তি) প্ল্যান্ট স্থাপন করা প্রয়োজন, যেখানে প্রতিদিনের বর্জ্য রিসাইকেল ও সার তৈরিতে ব্যবহৃত হবে।

একটি পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠলে বগুড়ায় শত শত তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, সার উৎপাদন এবং বিপণন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকার সংস্থান হবে। সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং ডাম্পিং স্টেশনের সীমাবদ্ধতার কারণে যা শহরের বড় মাথাব্যথা, সঠিক ব্যবস্থাপনায় তা-ই হয়ে উঠতে পারে বগুড়ার অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি। পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি উভয় সংকটের এককালীন সমাধান লুকিয়ে আছে এই ‘বর্জ্য থেকে সম্পদ’ ধারণার মধ্যেই। এখন প্রয়োজন শুধু প্রশাসনের সদিচ্ছা এবং নাগরিকদের সচেতনতা।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গবেষণাকাজে অনুসন্ধানী ক্রিডস নামে বেসরকারি সংস্থার পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আতিকুর রহমান মল্লিক জানান, সাধারণত বর্জ্য বাসাবাড়ি, শিল্প-কারখানা, চিকিৎসা খাতসহ বিভিন্ন উৎস থেকে আসে। এগুলোতে দস্তা, সালফার, ক্যাডমিয়াম, নাইট্রোজেন, অ্যামোনিয়া ইত্যাদি অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকে। এগুলোর অনুপাত আবার নির্ভর করে বর্জ্যের ধরনের ওপর। তবে বর্জ্য কোথাও স্তূপ করে রাখলে সেখানকার মাটি ও বাতাস দূষণ করবে। পানিতে মিশলে জলাশয়ের প্রাণবৈচিত্রে আঘাত হানবে। এগুলো এক-দুদিনে দেখা যায় না। এ জন্য মানুষ এর প্রভাব বুঝতে পারে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী প্রাণঘাতি রোগে আক্রান্ত হতে পারে বলে দাবী করেন ওই বিশেষজ্ঞ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেবল পরিবেশ রক্ষা করার পাশাপাশি এটি একটি শ্রমঘন শিল্পে পরিণত হয়েছে। বর্জ্য সংগ্রহ, সোর্সিং বা পৃথকীকরণ, পরিবহন থেকে শুরু করে রিসাইক্লিং ফ্যাক্টরি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তবে তাদের জীবনযাত্রার মান যেমন বাড়বে, তেমনি দারিদ্র্য বিমোচনেও তা বড় ভূমিকা রাখবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ে বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন জানান, বর্জ্য বগুড়া মহানগরের জন্য একটি বড় সমস্যা। আমরা পরিবহনের অভাবে সঠিক সময়ে শহরের বর্জ্য অপসারণ করতে পারছিনা। পরিবহনের চাহিদা পত্র দেওয়া হয়েছে। ট্রাক পেলে সেই সমস্যা দূর হবে। বর্জ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, এই বর্জ্য থেকে আমরা জৈব সার প্রস্তুত করতে পারি।

পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বগুড়ার মহাপরিচালক আব্দুল মজিদ বলেন, কিছু বর্জ্য নিয়ে রিসাইকেলিং করার জন্য একটি বেসরকারি উদ্যাক্তা প্রতিষ্ঠান মাধ্যমে সার তৈরীর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদি এমন কিছু হয় সেক্ষেত্রে আশার কথা হলো, এতে করে বগুড়া মহানগর থেকে বর্জ্য যেমন অপসারণ হবে তেমনি আয়ও করতে পারবে। আর সে আয় সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব খাতে ব্যায় হবে।

তাই, বর্জ্যকে অপচয় আর দূষণের কারণ হিসেবে না দেখে চাই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারেই  এই বর্জ্যই ফিরিয়ে দিতে পারে আমাদের উন্নত পরিবেশ, সম্পদ উৎপাদন, টেকসই উন্নয়নের সহায়ক শক্তি। এবং খুলতে পারে আগামী দিনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সুগম পথ।