শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

কবিকুঞ্জের স্মরণসভায় স্মৃতির আলোয় ফিরলেন সাহিত্যপ্রাণ রাজা, ইচক ও আমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৭ জুন ২০২৬ ১১:১৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ২৭ জুন ২০২৬ ১১:১৪ অপরাহ্ন
কবিকুঞ্জের স্মরণসভায় স্মৃতির আলোয় ফিরলেন সাহিত্যপ্রাণ রাজা, ইচক ও আমিন

নগরীর মিয়াপাড়ার সাধারণ গ্রন্থাগারের সভাকক্ষে শনিবার (২৭ জুন) বিকেলটা হয়ে উঠেছিল স্মৃতি, শোক আর ভালোবাসার এক আবেগঘন মুহূর্ত। লেখক-গবেষক ড. তসিকুল ইসলাম রাজা, কথাসাহিত্যিক-কবি ইচক দুয়েন্দে তথা শামসুল কবীর কচি এবং মরমি কবি আমিন মোহাম্মদকে স্মরণ করতে কবিকুঞ্জ আয়োজন করে ‘প্রয়াণে প্রিয়জন, স্মরণে সারাক্ষণ’ শীর্ষক স্মরণানুষ্ঠান। প্রিয় তিন সাহিত্য-মানুষের জীবন, কর্ম, সান্নিধ্য ও সৃষ্টির কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বক্তারা। 


অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবিকুঞ্জের সহ-সভাপতি শফিকুল আলম। কবিকুঞ্জের কোষাধ্যক্ষ আলমগীর মালেকের সঞ্চালনায় স্মৃতিচারণ করেন কবিকুঞ্জের উপদেষ্টা প্রফেসর নূরুল আলম, প্রফেসর আবুল কাশেম, প্রফেসর অনীক মাহমুদ, প্রফেসর অসীম কুমার দাস, অধ্যাপক ফরিদা সুলতানা, কবিকুঞ্জের সহ-সভাপতি বীথি সজিদা, কবিকুঞ্জের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল হক কুমার, সোনার দেশ পত্রিকার সম্পাদক আকবারুল হাসান মিল্লাত, আহমদ সফি উদ্দিন সহ উপস্থিত সাহিত্য-সংস্কৃতিজনেরা।


বক্তারা বলেন, মৃত্যু যেমন গভীর শোকের, তেমনি প্রিয় মানুষের অনতিক্রম্য বিচ্ছেদও জীবনে এক দীর্ঘ শূন্যতা তৈরি করে। ড. তসিকুল ইসলাম রাজা, ইচক দুয়েন্দে ও আমিন মোহাম্মদ দেহে না থাকলেও তাঁদের সৃজনশীল কর্ম, স্মৃতি ও সাহিত্যভাবনা রাজশাহীর মননশীল সমাজে চিরজাগরূক থাকবে। তাঁদের সাহিত্যকর্ম শুধু ব্যক্তিগত সৃষ্টির পরিচয় নয়, বরং রাজশাহীর সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।


ড. তসিকুল ইসলাম রাজাকে স্মরণ করে বক্তারা বলেন, ১৯৫৩ সালের ১৩ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া রাজা ছিলেন সাহিত্য, সংস্কৃতি, গবেষণা ও সংগঠক জীবনের এক উজ্জ্বল নাম। শৈশবের দারিদ্র্য, পিতৃহীনতার বেদনা ও নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কবি বন্দে আলী মিয়ার সহযোগিতায় রাজশাহী বেতারে কাজের সুযোগ পেয়ে তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন। পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স, এমএ ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ‘রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যে গ্রামীণ জীবন’ শীর্ষক গবেষণাসহ ভাষা আন্দোলন ও বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে তাঁর কাজ গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮টি। যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস’ রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পায় ১৯৯৮ সালে।


মরমি কবি আমিন মোহাম্মদকে স্মরণ করতে গিয়ে বক্তারা বলেন, ১৯৬২ সালের ২৫ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার পাহাড়পুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এই কবি শৈশবে পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে এসে রাজশাহীতে বেড়ে ওঠেন। পারিবারিক নাম মো. আমিনুল ইসলাম হলেও সাহিত্যজগতে তিনি আমিন মোহাম্মদ নামেই পরিচিত ছিলেন। জীবনসংগ্রামের টানাপোড়েনের মধ্যেও কবিতাই ছিল তাঁর আশ্রয়। তাঁর ‘দ্বিতীয় রাতের স্বর্গে’ ও ‘শূন্য একক শূন্য’ কাব্যগ্রন্থে সত্য, সৌন্দর্য, দর্শন ও আত্মজিজ্ঞাসার স্বতন্ত্র ভুবন নির্মিত হয়েছে।


ইচক দুয়েন্দেকে স্মরণ করে বক্তারা বলেন, প্রকৃত নাম শামসুল কবীর কচি হলেও সাহিত্যজগতে তিনি ইচক দুয়েন্দে নামে নিজস্ব পরিচয় নির্মাণ করেন। কবি, কথাকার, প্রকাশক, সম্পাদক ও অনুবাদক হিসেবে তিনি গতানুগতিক সাহিত্যধারার বাইরে এক পরীক্ষাধর্মী ভুবন তৈরি করেছিলেন। আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও লিটল ম্যাগ আন্দোলনের পরিসরে তিনি নতুন চিন্তা, ভাষা ও সৃজনধারার অন্যতম কারিগর হয়ে ওঠেন।


‘কলাপক’, ‘পেঁচা’সহ বিভিন্ন লিটল ম্যাগের উদ্যোগ, ব্যতিক্রমী গদ্যভাষা ও শব্দচয়নে তিনি বিকল্প সাহিত্যচর্চার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বক্তারা আরও বলেন, রাজশাহীর সাহিত্যচর্চার পথে এই তিনজন ছিলেন নিত্য সহযাত্রী। তাঁদের প্রস্থান বেদনাদায়ক হলেও তাঁদের কর্ম, চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতা আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে। সীমিত আয়োজন হলেও উপস্থিত সবার ভালোবাসা ও অংশগ্রহণে স্মরণসভাটি হয়ে ওঠে গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও আবেগের এক স্মরণীয় বিকেল।