কংক্রিটের নগরীতে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ খেলার মাঠ
এক দশক আগেও বিকেলের আলো নরম হয়ে এলে রাজশাহী মহানগরীর পাড়া-মহল্লা মুখর থাকত ফুটবলের লাথি, ক্রিকেট বলের শব্দ আর কিশোরদের উচ্ছ্বাসে। সেই প্রাণচাঞ্চল্য এখন ক্রমেই স্তব্ধ। কংক্রিটের উঁচু দালান ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার যানজটে শিশু-কিশোরদের দৌড়ানোর জায়গা নেই। আকাশে কংক্রিটের জঙ্গল যত উঁচু হচ্ছে, তত নিচু হয়ে আসছে শিশুদের খেলার স্বপ্ন। খেলার মাঠের সংখ্যা এমনিতেই সীমিত। যা আছে তারও বড় অংশ খেলার অনুপোযোগী। কোথাও অবকাঠামো, কোথাও দখলদারিত্বের ছাপ।
একসময়কার খেলার মাঠে এখন বিশাল অট্টলিকা শোভা যাচ্ছে। কোথাও নির্মাণসামগ্রীর গুদাম, কোথাও টিন দিয়ে ঘেরা অংশবিশেষ। এতে নগরীর শিশু-কিশোর ও তরুণরা খেলাধুলার স্বাভাবিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মাঠে গিয়ে ঘাম ঝরানোর বদলে তারা চার দেয়ালের বন্দি জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ওপর। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, একটি সুস্থ নগরীর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ উন্মুক্ত সবুজ ও খেলার মাঠ অপরিহার্য। কিন্তু পরিকল্পিত উন্মুক্ত জায়গা এখন প্রায় বিলাসিতা। বহুতল ভবন উঠেছে দ্রুতগতিতে, অথচ শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা হয়নি।
অন্যদিকে, খেলার মাঠের সঙ্কটে রাজশাহীর তরুণ ও ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে কৃত্রিম টার্ফ বা মাঠের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে এই সুবিধাটি বেশ ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক যুগে রাজশাহী নগরীর অধিকাংশ বড় বড় উন্মুক্ত খেলার মাঠগুলোতে খেলাধুলার সুযোগ বন্ধ হয়েছে। বেদখল এবং কিছু ক্ষেত্রে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
নগরীর মির্জাপুরের শ্যামলের মাঠ একসময় বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের অন্যতম খেলার মাঠ ছিল। কিন্তু বর্তমানে দখল ও আশপাশে বাড়িঘর নির্মাণ হওয়ার কারণে সেটি সংকুচিত হয়ে একেবারেই খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
একই দশা কাজলা এলাকার বেতারের মাঠের। একসময় এটি নগরীর অন্যতম বড় উন্মুক্ত স্থান ছিল। অথচ বর্তমানে সরকারি বনায়ন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলের কারণে সেখানে শিশু-কিশোরদের পা ফেলারও জায়গা অবশিষ্ট নেই। নগরীর অভিজাত দুই এলাকা উপশহর ও পদ্মা আবাসিকের অবস্থাও একই। আগে এখানে ফাঁকা জায়গায় শিশু-কিশোররা খেলাধূলা করলেও এখন সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠছে।
বৈকালী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রইস উদ্দিন আহমেদ বাবু বলেন, কোথাও বাড়িঘর নির্মাণ হয়েছে। কোথাও আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মাঠে স্থাপনা নির্মাণ করেছে। যেসব মাঠ এখনও সবার জন্য উন্মুক্ত, সেখানে শীতকালে বেশিরভাগ সময় হয় মেলাসহ নানা কর্মকাণ্ড। ফলে রাজশাহীতে খেলার মাঠের সংকট প্রকট হয়েছে।
মাঠের সংকটের কারণে তরুণ ও ক্রীড়াপ্রেমীদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে নগরীতে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে ‘কৃত্রিম মাঠ’ বা ‘টার্ফ’-এর জনপ্রিয়তা। যেখানে খেলতে এক থেকে দু ঘণ্টার জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে তিন থেকে ছয় হাজার টাকা।
রাজশাহী জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেনের বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা এই কৃত্রিম টার্ফের বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তিনি বলেন, শহরের তরুণদের জন্য অন্তত খেলাধুলার একটি আধুনিক বিকল্প তৈরি হচ্ছে, যা তাদের খেলাধুলায় যুক্ত রাখছে। এটি ইতিবাচক। এটা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নীতিমালা নেই। ন্যূনতম ফি দিয়ে যাতে সবাই খেলার সুযোগ পান, সেটা নিয়ে আমরা কথা বলব।
খেলার মাঠের অভাবে প্রযুক্তি ও ডিভাইস আসক্তি বাড়ছে। শিশু-কিশোররা স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। প্রায়ই তারা রাজশাহীতে আয়োজন করছে ফ্রি-ফায়ার, পাবজির মতো ই-স্পোর্টস টুর্নামেন্ট। অনলাইন গেমে আসক্তি বাড়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা।
ভদ্রা এলাকার খোরশেদ আলম বলেন, আগে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় খেলার মাঠে টুর্নামেন্ট হতো। এখন হয় না। ফলে শিশু-কিশোর ও তরুণরা প্রায়ই দলবেঁধে ফ্রি-ফায়ার বা পাবজির মতো ই-স্পোর্টস টুর্নামেন্টের আয়োজন করছে। এসব করতে ভালো টাকা ব্যয় হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিশু-কিশোরদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলার মাঠের বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশ মোতাবেক প্রতিটি উপজেলায় খেলার মাঠ রক্ষা ও নতুন মাঠ তৈরিতে উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।