মহাদেবপুরে কাঁচামরিচের অবৈধ হাটের ফাঁদে কৃষক কাঁদে!
বছর আসে বছর যায়। চলে গেছে প্রায় দুই যুগ। কিন্তু দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম কাঁচামরিচের অবৈধ (অনুমোদনহীন) পাইকারি হাট আইনগত পক্রিয়ার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে সরকারি রাজস্ব আদায়ের কোনই উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রশাসনে অভিযোগ করে মিলছেনা প্রতিকার। কোটি টাকার মরিচ বেচাকেনা হলেও রাজস্ব পাচ্ছে না সরকার। এতে প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। এটিকে সরকারি ফাইলে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য হিসেবেই দেখছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
আর সিন্ডিকেট করে প্রতিদিন লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে। নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার মমিনপুরের এই হাটে চলে না সরকারি আইন। ৪২-৪৫ কেজিতে মণ। আড়তদারদের বেঁধে দেওয়া দামেই হাটে মরিচ বিক্রি করতে হচ্ছে চাষিদের। ফলে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক। রহস্যজনক কারণে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। প্রশাসন বলছে, তদন্ত চলছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইন প্রয়োগের দাবি চাষিদের। প্রতিদিন এখান থেকে ট্রাকে ট্রাকে কাঁচামরিচ ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শহরে যাচ্ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এ হাট।
সফাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তথ্যমতে, ২০২২ সালে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জেলার মহাদেবপুর উপজেলার সফাপুর ইউনিয়নের মমিনপুর মৌজার ৫৪৩, ৫৪৪, ৫৪৫ নম্বর দাগে মোট ০ দশমিক ৪১ একর এবং পাহাড়পুর মৌজার ৫৬ নম্বর দাগে ০ দশমিক ৩৬ একর ও ৫৭ নম্বর দাগে ০ দশমিক ৫০ একর জমির ওপর মরিচের হাটটি বসান। প্রতিবছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চালু থাকে। ৫ বছর ধরে চলছে এ হাট।
মরিচের অফ সিজনে হাট বন্ধ থাকে। ২০২৪ সালের ২০ জুন ৪৮ নম্বর স্মারকে সফাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে মমিনপুর মোড়ে হাটের প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়। যার মহাদেবপুর উপজেলা ভূমি অফিসের ২৪ জুন ২০২৪ তারিখের স্মারক নম্বর ১০৭৮। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় হাট সৃজনের প্রস্তাব এখনও আলোর মুখ দেখেনি। বিষয়টি সরকারি ফাইলে লাল ফিতায় বন্দি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে- প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই চলছে এই অবৈধ হাট।
এর আগে ২০০৫ সাল থেকে হাটটি বসত একই ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর। ২০২১ সালে অবৈধ মরিচের হাট ও সিন্ডিকেটের বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রশাসনের চাপে মমিনপুর মোড়ে নিয়ে আসা হয়। ভরা মৌসুমে প্রতিদিন ৮০-৯০ মেট্রিক টন মরিচ বিক্রি হয়। বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করে ১০-১৫ জন আড়ত সিন্ডিকেট। প্রতিদিন সকালে আড়তদাররা মরিচের দাম ঘোষণা করেন। ওই দামেই চলে কেনাবেচা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২২ সাল থেকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নিয়ে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পর্যন্ত নিজেকে সভাপতি দাবি করে হাটটি নিয়ন্ত্রণ করতেন পাহাড়পুর জিতেন্দ্রনাথ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সুলতানপুর এলাকার তারিকুল ইসলাম পলাশ। এ চক্রের সদস্য সংখ্যা ১৫-২০ জন। প্রতিবছর মরিচের সিজনে তাদের পকেটে যাচ্ছে ৪৫-৫০ লাখ টাকা। চক্রের সদস্যরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় এদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস করে না কেউই।
অভ্যুত্থানের পর পলাশের বন্ধু সফাপুর ইউপি চেয়ারম্যানের ভাই সাদেকুল ইসলাম নিজেকে সভাপতি দাবি করে হাটটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পরিচালনা করছেন। আড়তদারদের কাছ থেকে অবৈধভাবে বস্তাপ্রতি ৪০ টাকা হারে খাজনা আদায় করা হচ্ছে। সাদেকুল রাজনৈতিক প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন আইন প্রয়োগের সাহস করছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
কৃষক আব্দুল আজিজ বলেন, এটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত হাট। বাধ্য হয়ে এখানে মরিচ বিক্রি করি। যে দামে মরিচ কেনা হচ্ছে; তাতে উৎপাদন খরচ উঠবে না। হাটে মরিচ বিক্রি করতে আসা চকগড়া গ্রামের কৃষক ইয়াদ আলী বলেন, মরিচ বিক্রির জন্য এসেছি ভালো দাম পাচ্ছি না। প্রতি কেজি ১৮-২২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আড়তদাররা ৪২-৪৪ কেজিতে মণ হিসেবে ওজন নিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এক জোট হয়ে মরিচ ক্রয় করায় তারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ইমরান হোসেন বলেন, বাজারে ঝাল নিয়ে এসে বিভিন্ন সময় নানা সমস্যার সম্মুখীন হই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৪২ কেজিতে মণ কেনা যাবে না। কিন্তু এই হাটে ৪২-৪৪ কেজিতে মণ কেনা হচ্ছে। কখনো কখনো ৪৫ কেজিতেও মণ কেনা হয়। মুরাদ হোসেনসহ ৪-৫ জন আড়তদার বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৮০-৯০ মেট্রিক টন মরিচ কেনাবেচা হয়। কৃষকদের কাছ থেকে কোন খাজনা নেওয়া হয় না। ৮০-৮২ কেজির প্রতি বস্তায় ৪০ টাকা করে খাজনা পলাশ ও তার সহযোগিদের দিতে হয়। এ কারণে কিছুটা বেশি ওজন নিতে হয় বলে দাবি তাদের।
অভিযুক্ত মাস্টার তারিকুল ইসলাম পলাশ দাবি করেন, এখন হাটটি তিনি পরিচালনা করছেন না। তার বন্ধু সফাপুর ইউপি চেয়ারম্যানের ভাই সাদেকুল ইসলাম দায়িত্বে রয়েছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি অভিযুক্ত সাদেকুল ইসলাম সাদেক। নওগাঁর কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সোহাগ সরকার বলেন, প্রশাসনের মাধ্যমে ৪০ কেজিতে মণ বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মানজুরা মুশাররফ বলেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন অবৈধ হাট পরিচালনা করে খাজনা আদায়ের সুযোগ নেই। তদন্ত চলছে। প্রতিবেদন পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জানতে চাইলে মুঠোফোনে নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জান্নাত আরা তিথি বলেন, মহাদেবপুর ইউএনওকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।