শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

পদ্মার দুর্গম চরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর দাপটে আতঙ্ক

৯ মাসে ৭ জনকে গুলি করে হত্যা
নিজস্ব প্রতিবেদক ২৮ জুন ২০২৬ ১০:৫৯ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ২৮ জুন ২০২৬ ১০:৫৯ অপরাহ্ন
পদ্মার দুর্গম চরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর দাপটে আতঙ্ক

রাজশাহী-নাটোর-পাবনা ও কুষ্টিয়া নিয়ে গড়ে উঠা পদ্মার দুর্গম চর সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য পরিণত হয়েছে। দিনের আলোয় প্রকাশ্যে স্পিডবোটে অস্ত্রের মহড়া, ড্রোনের সহায়তায় অবস্থান শনাক্ত করে গুলি ও প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চলে এই চরে। বিস্তীর্ণ এই চর এলাকা ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বালুমহাল ও চর দখল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর দাপটে পুরো অঞ্চল পরিণত হয়েছে আতঙ্কের জনপদে।


পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দা বলছেন, বিস্তীর্ণ নদীর বালু উত্তোলন, চরের ভূমি নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজি নিয়ে বারবার সহিংসতা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। গেল বছরে অপারেশন চালিয়ে সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার এবং আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল। এরপর অপরাধও কমে আসে। তবে আট মাস পার হওয়ার পর আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীরা।


পুলিশ বলছে, পদ্মার চরাঞ্চলে সক্রিয় আছে ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এর মধ্যে রয়েছে- কাঁকন, মণ্ডল, টুকু, সাঈদ, লালচাঁদ, রাখি, শরীফ, রাজ্জাক, চল্লিশ, বাহান্ন এবং সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনী। এদের আলোচিত নাম ‘কাঁকন বাহিনী’। হাসানুজ্জামান কাঁকন নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে এই বাহিনী রাজশাহীর বাঘা, চারঘাট, নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়ার দেলৗতপুরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। 


গেল ১৫ জুন নাটোরের লালপুর উপজেলার রায়তা চরে যাত্রীবাহী একটি নৌকায় গুলি চালায় বন্দুকধারীরা। এতে সাহাবুল ইসলাম নামের একজন নিহত হন। আহত হন আরও একজন। ৯ জুন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চর জাজিরায় হামলাকারীরা একটি বালু মহালের ব্যবস্থাপক আজিজুল হাকিমকে গুলি করে হত্যা করে। 


চরের সশস্ত্র বাহিনীর তথ্য গেল বছরের অক্টোবরে প্রকাশ্যে আসে। সে সময় চরের জমি, বালু উত্তোলন এবং আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জের ধরে গোলাগুলিতে তিনজন নিহত হয়েছিল। ২৭ অক্টোবর গোলাগুলিতে মারা যান আমান মণ্ডল, নাজমুল হোসেন ও ২৮ অক্টোবর মারা যান লিটন হোসেন নামের আরেকজন। তবে এরা সবাই বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্য ছিল বলে দাবি করে পুলিশ। মারা ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা দাবি করে, তারা সবাই কৃষক ছিল।   


এছাড়াও চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি গভীর রাতে নাটোরের লালপুরে সোহেল রানা নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। গেল ১৮ মে সশস্ত্র ব্যক্তিরা রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কালিদাসখালী পদ্মা চর থেকে স্বপন ব্যাপারি নামের এক জেলেকে গুলি করে তুলে নিয়ে যায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পরিবারের সদস্যরা তার মরদেহ পাননি। তার ভাগ্যে কী ঘটেছে সে সম্পর্কেও কিছু জানেন না তারা।


স্বপনের বাবা সিদ্দিক ব্যাপারি বলেন, চোখের সামনেই আমার ছেলেকে গুলি করে নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। আমি জানি না ও কোথায় আছে, কেমন আছে বা ওর কী হয়েছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস ও আর বেঁচে নেই। আমার সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো, আমি আমার ছেলের মরদেহটাও উদ্ধার করতে পারিনি। 


চরাঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, আধিপত্য বিস্তার, চর দখল ও অর্থ উপার্জন নিয়ে কার্যকলাপ নিয়ে শত্রুতা সবসময়ই ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।


চরাঞ্চলীয় গ্রামগুলোর বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের তিনজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই পরিস্থিতির জন্য পুলিশের দুর্বল নজরদারি এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরা দায়ী। ক্ষমতা হস্তান্তরের ফলে একসময় বিশাল চরাঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতা খর্ব হয়েছে। নদীখাতগুলোতে ঘুরে বেড়ানো সশস্ত্র দলগুলো অবাধ বিচরণের সুযোগ পেয়েছে। 


গ্রামবাসীরা জানান, প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে স্পিডবোটে করে প্রায়ই নদীতে ঘুরে বেড়ায় এবং চরের মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদ্মা চরের এক বাসিন্দা বলেন, আমরা মাঝে মাঝে গুলির শব্দ শুনি। অনেকেই সন্ধ্যার পর যাতায়াত করা এড়িয়ে চলেন। এই গ্যাংগুলোর কার্যকলাপ নিয়ে কথা বলতেও ভয় লাগে।


গেল বছরের ২৮ নভেম্বর রাজশাহী, নাটোর ও পাবনায় ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ অপারেশন করা হয়। অপারেশনে ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী। তবে এরা জামিনে বের হয়ে এসে আবারও সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করেছে।  রাজশাহী রেঞ্জের উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. শাহজাহান বলেন, চরে গোলাগুলির প্রধান কারণগুলো হলো বালু উত্তোলন, এলাকার নিয়ন্ত্রণ এবং নৌপথে চাঁদাবাজি। ইজারা নেওয়া বালুর মহালের সীমানা নিয়ে প্রায়শই বিরোধ দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে ইজারা নেওয়া বালু উত্তোলন এলাকার সীমানা স্পষ্টভাবে বজায় রাখা হয় না। এমনকি যখন সেগুলো নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। তখনও প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলো সবসময় তা মেনে নেয় না, যার ফলে বিবাদ ও সহিংস সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।


তিনি বলেন, পদ্মা নদীর দুই তীরে একদিকে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা এবং নদীর ওপারে কুষ্টিয়ায় বেশ কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এখন পর্যন্ত কাকনকে ঘিরে নানা তথ্য আসছে। যদিও বর্তমানে তিনি বাস্তবে কতটা সক্রিয় তা জানা যাচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করছি তাকে গ্রেপ্তার করার। 


ডিআইজি বলেন, সম্প্রতি একটি অভিযান চলাকালে সশস্ত্র অপরাধীরা একটি পুলিশ দলের ওপর গুলি চালালে পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পদ্মা চর অঞ্চলের দুর্গমতার কারণে পুলিশের অভিযান কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন জেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে অনেক ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রস্তুতি সম্পন্ন করার আগেই অপরাধীরা প্রায়শই তাদের কার্যক্রম শেষ করে চলে যায়। অনেক অভিযুক্ত গ্যাং নেতা সহযোগীদের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থান থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। 


তিনি আরও বলেন, বর্তমানে পদ্মা চরে আরেকটি যৌথ অভিযানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। আমরা বাঘার চর এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনা করছি। অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কাজ চলছে।