শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

যমুনার গ্রাসে শতাব্দি প্রাচীন বিদ্যালয়, বাঁধের ওপরেই জ্বলছে শিক্ষা প্রদীপ!

দীপক সরকার,বগুড়া ২৯ জুন ২০২৬ ১০:২৫ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
দীপক সরকার,বগুড়া ২৯ জুন ২০২৬ ১০:২৫ অপরাহ্ন
যমুনার গ্রাসে শতাব্দি প্রাচীন বিদ্যালয়, বাঁধের ওপরেই জ্বলছে শিক্ষা প্রদীপ!

শত বছরের কত শত স্মৃতি, কত প্রজন্মের শৈশবের হাসিকান্না আর হাজারো স্বপ্নের চারণভূমি ছিল যে বিদ্যাপীঠটি, প্রমত্তা যমুনার এক নিমেষের গ্রাসে আজ তা কেবলই ইতিহাস। রাক্ষুসে নদীর তীব্র ভাঙনে চোখের সামনে বিলীন হয়ে গেছে শতাব্দি পার করা সেই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়। তবে ইট-কাঠের দেয়াল নদী কেড়ে নিতে পারলেও, দমাতে পারেনি অক্ষরের প্রতি একদল শিশুর অদম্য তৃষ্ণাকে। ভাঙনের বুক চিরে, খোলা আকাশের নিচে, যমুনার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ধুলোবালিকেই এখন তারা বানিয়ে নিয়েছে তপ্ত শ্রেণীকক্ষ।

কয়েক সপ্তাহ আগেই যমুনা নদীর ভাঙনে সেটি বিলীন হয়ে যায়। ষষ্ঠবারের মতো যমুনার গর্ভে হারিয়ে গেছে শতাব্দি প্রাচীন বগুড়ার চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। চারদিকে অনিশ্চয়তা, মাথার ওপরে অস্থায়ী ছাউনি। তবু থেমে নেই পাঠদান।

সর্বশেষ গত ১৬ মে একশত সাত বছরের পুরোনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি যমুনার গর্ভে হারিয়ে যায়। এরপর থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর অস্থায়ীভাবে টিনের ছাউনি নির্মাণ করে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। বৃষ্টি শুরু হলেই টিনের চালা দিয়ে পানি পড়ে বই খাতার ওপর। দমকা বাতাস এলে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে থাকে শিক্ষার্থীরা। তবুও চলে পাঠদান।

জানা যায়, ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একসময় ছিল এলাকার শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র। তখন বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী ছিল ৪৮২ জন। কিন্তু বছরের পর বছর নদীভাঙনে গ্রাম হারিয়েছে মানুষ, উজাড় হয়েছে বসতি। পরিবারগুলো অন্যত্র চলে যাওয়ায় বিদ্যালয়টিতেও কমেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বর্তমানে সেখানে শিক্ষার্থী রয়েছে মাত্র ৭৪ জন।

বিদ্যালয়ে ছয়জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও দুজন প্রশিক্ষণে থাকায় বর্তমানে চারজন শিক্ষক অস্থায়ী পরিবেশেই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। বিদ্যালয়ে পৌঁছানোও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিনের এক সংগ্রাম। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী দিপু বাবু প্রতিদিন সুজাতপুর চর থেকে প্রায় আধা ঘণ্টা হেঁটে ঘাটে আসে। এরপর নৌকায় নদী পার হয়ে আরও প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে পৌঁছাতে হয় স্কুলে।

শিক্ষার্থী দিপু বাবু বলেন, স্কুলটা যদি ভালো জায়গায় থাকত, তাহলে আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারতাম। খেলাধুলাও করতে পারতাম।

পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়ার অবস্থাও একই। তাকে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। খেয়া নৌকা না পেলে কিংবা আবহাওয়া খারাপ থাকলে অনেক সময় স্কুলে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। বিদ্যালয় ভবন নদীতে বিলীন হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা বন্ধ না করতে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে বাঁধের ওপর টিনের চালা নির্মাণ করেছেন শিক্ষকরা। সেখানেই চলছে শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জিন্নাহ আলম বলেন, গত প্রায় ১০ বছরে আমার চোখের সামনেই বিদ্যালয়টি পাঁচবার নদীতে বিলীন হয়েছে। এবার নিয়ে ষষ্ঠবার। নতুন জায়গায় বিদ্যালয় স্থানান্তরের জন্য মাটি ভরাট ও ঘর নির্মাণে সরকারি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনো অর্থ পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়টি নতুন স্থানে স্থানান্তর করতে প্রায় ৮০ হাজার টাকার প্রয়োজন।

সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টি শুরু হলেই টিনের চালা দিয়ে পানি পড়ে। বই-খাতা ভিজে যায়। তখন পাশের কোনো বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। বৃষ্টি থামলে আবার ক্লাস শুরু করি। এতে শিশুদের মনোযোগ নষ্ট হয়। এই পরিবেশে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া খুব কঠিন।’

চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই চিত্র এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। যমুনার ভাঙন ধীরে ধীরে সারিয়াকান্দির পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলছে। নদী যত এগোচ্ছে, ততই ছোট হয়ে আসছে শ্রেণিকক্ষ, কমে যাচ্ছে শিক্ষার্থী, আর অনিশ্চিত হয়ে উঠছে নদীপাড়ের হাজারো শিশুর ভবিষ্যৎ। তবে স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, চকরতিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংকটই সারিয়াকান্দির একমাত্র চিত্র নয়। যমুনার অব্যাহত ভাঙনে পুরো জনপদের শিক্ষাব্যবস্থা এখন টালমাটাল। স্থানীয়দের অভিযোগ, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলার কামালপুর, হাটশেরপুর, শিমুলতাইড়, হাসনাপাড়া, ইছামারা, দড়িপাড়া ও কর্নিবাড়িসহ প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীভাঙন চলছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও করমজাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরইমধ্যে নদীভাঙনের কারণে নয়াপাড়া, চকরতিনাথ ও দক্ষিণ হাটবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান অন্যত্র অস্থায়ীভাবে চালাতে হচ্ছে। ফলে চরাঞ্চলের শিশুরা নিয়মিত ও স্বাভাবিক পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

হাটশেরপুর ইউনিয়নের শেরপুর গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য বকুল মিয়া বলেন, ‘গত কয়েক বছরে নদীভাঙনের কারণে চকরতিনাথ, করমজাপাড়া, ধনেরপাড়া, কর্নিবাড়ি ও শিমুলবাড়ি গ্রামের প্রায় দেড় হাজার পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। শেরপুর গ্রামটিও এখন অস্তিত্ব সংকটে। মানুষ চলে গেলে স্কুলে শিক্ষার্থী থাকবে কীভাবে? আগে যে স্কুলগুলো শিশুদের কোলাহলে মুখর থাকতো, এখন সেখানে শিক্ষার্থীই পাওয়া যায় না।’

তিনি জানান, সম্প্রতি প্রায় ৩০০ বিঘা ফসলি জমি যমুনায় বিলীন হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন দেখা দিচ্ছে। অনেক পরিবার দিনের বেলায় ঘর খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে, আবার রাত কাটাচ্ছে অনিশ্চয়তার মধ্যে।

সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, উপজেলার চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিদ্যালয় ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। সেটি স্থানান্তরের কাজ চলমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিস প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং উপজেলা প্রশাসন সহযোগিতা করছে। ভাঙন প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, জেলার প্রায় ১১ কিলোমিটার নদীতীর বর্তমানে ভাঙনের কবলে রয়েছে। সারিয়াকান্দির কামালপুর থেকে শহরাবাড়ী স্পার, সোনাতলার পাকুল্ল্যা থেকে হাটশেরপুর এবং ধুনটের শহরাবাড়ী থেকে বানিয়াজান পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলা হচ্ছে। শহরাবাড়ী ও বানিয়াজান স্পার শক্তিশালী করা এবং ৪৫ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামতের পরিকল্পনা রয়েছে। একটি স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পও প্রক্রিয়াধীন। অনুমোদন পেলে স্থায়ী কাজ শুরু হবে।’