শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলের বদলে আসছে এসকাফ

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৯ জুন ২০২৬ ১০:৫১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ২৯ জুন ২০২৬ ১০:৫১ অপরাহ্ন
সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিলের বদলে আসছে এসকাফ

রাজশাহীতে এক সময়ে হাত বাড়ালেই পাওয়া যেত ফেনসিডিল। তবে দাম বেশি হওয়ায় সেই মাদকও আর আসছে না। এর বদলে সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে নতুন মাদক এসকাফ। রাজশাহীর সীমান্তে এখন আর ফেনসিডিলের বড় চালান আগের মতো ধরা পড়ছে না। যে পথ একসময় হাজার হাজার বোতল ফেনসিডিল চোরাচালানের জন্য কুখ্যাত ছিল, সেখানে এক ধরনের রহস্যময় নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙছে এসকাফ নামক নতুন এক মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়িয়ে নতুন মোড়কে ভারত থেকে আসছে এই সিরাপ।


এত দিন যারা ফেনসিডিলের কারবার করতেন, তাদের অনেকেই এখন নতুন এই মাদক কারবারে জড়িয়েছেন। বাংলাদেশে তুলনামূলক কম পরিচিত হওয়ায় কাশির সিরাপ পরিচয় দিয়ে এসকাফ নামের এই মাদক নিয়ে আসছেন তারা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ফেনসিডিল ও এস্কাফ মূলত একই জিনিস। দুটিই কোডিন ফসফেট মিশ্রিত মাদক। ভিন্ন নাম ও ফেনসিডিলের চেয়ে দামে কম হওয়ার কারণে মাদকসেবীরাও এটার দিকে ঝুঁকছেন।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরপাড়া থানাধীন লালকূপ এলাকাসংলগ্ন বাঘা উপজেলার আলাইপুর ও মীরগঞ্জ এলাকা দিয়ে এবং মুর্শিদাবাদের জলঙ্গী থানাসংলগ্ন রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার মুক্তারপুর ও ইউসুফপুর এলাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত এসকাফ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। এছাড়াও পবা ও গোদাগাড়ী উপজেলা দিয়েও এই মাদক প্রবেশ করানো হচ্ছে।  


ভারতের ল্যাবোরেট ফার্মাসিউটিক্যালস এটি উৎপাদন করলেও নেশার কাজে ব্যবহারের কারণে সেখানে এটি নিষিদ্ধ। তবে সীমান্তসংলগ্ন জলঙ্গী ও সাগরপাড়া এলাকায় গোপনে ড্রাম ভর্তি তরল সিরাপ এনে বোতলজাত করে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। মাঝ নদীতে জেলেদের নৌকার মাধ্যমে জালের ভেতর লুকিয়ে এসব মাদকের প্যাকেট হস্তান্তর করা হয়।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাঘার মনিগ্রাম, চারঘাট, সরদাহ, ইউসুফপুর, কাজলা, বেলপুকুরিয়া, হরিপুর, গোদাগাড়ী ও মহানগরীতে দিয়ে এই মাদক আসছে। এছাড়াও এসব রুট দিয়ে হেরোইনও প্রবেশ করছে। 


মাঝ নদীতে জালের ভেতরে মাদক সম্পর্কে পদ্মা নদীর চরে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরপাড়া ও জলঙ্গী এলাকায় এই সিরাপ প্যাকেটজাত হয়। সেখান থেকে জেলেদের নৌকায় করে মাঝ নদীতে আনা হয়। পরে জালের ভেতরে লুকিয়ে সেই প্যাকেট বাংলাদেশের জেলেদের নৌকায় হস্তান্তর করা হয়। 


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারবারি জানান, বর্তমানে এক বোতল ফেনসিডিল ৩-৪ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এসকাফ মিলছে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার  টাকায়। দাম কম ও কাশির সিরাপ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া সহজ হওয়ায় এর চাহিদা বাড়ছে। তবে এই সহজলভ্যতা ডেকে আনছে পারিবারিক মহাবিপদ। 


চারঘাট উপজেলার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছেলে নেশাগ্রস্ত। আগে ফেনসিডিল হাতের নাগালে না থাকায় উপদ্রব কম ছিল। এখন ওষুধের দোকানেও এই নতুন সিরাপ পাওয়ায় সে সকাল-বিকাল টাকার জন্য বাড়ির জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে। টাকা না দিলে আমাদের মেরে ফেলার বা আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছে।


চারঘাট উপজেলা কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতির সভাপতি মাহাবুব ই আলম বলেন, কিছু অসাধু ফার্মেসি ব্যবসায়ী দোকান ছাড়া আলাদা গোডাউন ও নিজ বাসায় এসব নিষিদ্ধ ভারতীয় সিরাপ রাখছে এবং টোকেন সিস্টেমে বিক্রি করছে। আমরা নিজেরা এ বিষয়ে তদন্ত করছি এবং প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নিলে তাদের পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে।


রাজশাহী জেলার ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত ওষুধ ছাড়া এ ধরনের সিরাপ ফার্মেসিতে রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ। আমাদের অভিযান নিয়মিত চলমান আছে।


চিকিৎসক তরিকুল ইসলাম বলেন, এসকাফ সেবন করলে কিডনি ও লিভার অকেজো হয়ে পড়ে এবং পুরুষের প্রজননক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এই মাদক রোধ করতে না পারলে যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।   


মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, এই জেলার সীমান্ত দিয়ে এখন ফেনসিডিল আসে না বললেই চলে। এখন এর বিকল্প হিসেবে এসকাফ আসছে। সীমান্ত এলাকায় এর দাম ফেনসিডিলের চেয়ে কম। এ কারণেও হয়তো মাদক কারবারিরা এস্কাফ নিয়ে আসতে পারেন।


তিনি আরও বলেন, মাদক কারবারিরা প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাচ্ছে। এমনকি অনেক দোকানে গ্লাসে ঢেলে এটি সেবন করানো হচ্ছে। তবে বিজিবি ও পুলিশ সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়েছে, যাতে এই নতুন মাদকের বিস্তার রোধ করা যায়।