তৃণমূলে নারী নেতৃত্ব জোরদারে এসডিজি মডেল ভূমিকা রাখছে: জেলা প্রশাসক
“টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা শুধু নীতিমালা বা কাগজের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সমতা প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত করার একটি বাস্তব প্রক্রিয়া। এই লক্ষ্য অর্জনে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণ এবং অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা গেলে একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।” মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকালে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত ‘এসডিজি ৫ ও এসডিজি ১৬ বিষয়ক এসডিজি মডেল ডিসেমিনেশন সেশন’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, “নারীরা সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী। তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। স্কুল ও মাদ্রাসার কিশোরী শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ করে দেওয়া ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। আজ যারা শিক্ষার্থী, আগামী দিনে তারাই পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেবে। তাই ছোট বয়স থেকেই তাদের আত্মবিশ্বাস, নাগরিক দায়িত্ববোধ, অধিকার সচেতনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।”
জেলা প্রশাসক বলেন, “এসডিজি ৫ আমাদের লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলে, আর এসডিজি ১৬ আমাদের শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গঠনের দিকনির্দেশনা দেয়। এই দুটি লক্ষ্য পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। নারী যদি নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ, মত প্রকাশ এবং নেতৃত্বের সুযোগ না পায়, তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আবার প্রতিষ্ঠানগুলো যদি জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক না হয়, তাহলে নারীর ক্ষমতায়নও পূর্ণতা পাবে না।”
তিনি বলেন, “রাজশাহীতে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, উন্নয়ন সহযোগী এবং কমিউনিটির মধ্যে সংযোগ তৈরি হলে সামাজিক পরিবর্তন আরও দ্রুত ও কার্যকর হয়। এই মডেল শুধু একটি প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির একটি কাঠামো। এই কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করা গেলে তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব, যুব অংশগ্রহণ এবং সুশাসনের চর্চা আরও শক্তিশালী হবে।”
নারীর নেতৃত্ব বিকাশ, তরুণীদের ক্ষমতায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসনকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করতে এসডিজি স্থানীয়করণ মডেলের গুরুত্ব তুলে ধরে মঙ্গলবার সকালে রাজশাহী নগরের গ্র্যান্ড রিভার ভিউ হোটেলে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইউএনওপিএস বাংলাদেশ ও ইউএন উইমেনের যৌথ উদ্যোগে সভার আয়োজন করা হয়। জয়েন্ট এসডিজি ফান্ডের সহায়তায় পরিচালিত ‘বাংলাদেশে এসডিজি ৫ ও এসডিজি ১৬ স্থানীয়করণের মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এ ডিসেমিনেশন সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী—এই তিন জেলায় বাস্তবায়িত এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ৯০০ জন নারী শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব বিকাশ, অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরিতে কাজ করা হয়েছে।
সভায় বক্তারা বলেন, কিশোরী ও তরুণীরা, বিশেষ করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ছাত্রীরা অনেক সময় নেতৃত্বের ক্ষেত্র, নাগরিক সংলাপ এবং অধিকারভিত্তিক সচেতনতা থেকে বঞ্চিত থাকে। এ ধরনের উদ্যোগ তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের দক্ষতা ও সমাজে অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করছে। স্থানীয় পর্যায়ে এসডিজি বাস্তবায়নের এই মডেল ভবিষ্যতে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাজশাহীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান বলেন, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে নারীর নেতৃত্ব ও নাগরিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ নারীদের জন্য নিরাপদ ও সক্ষম পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সভায় আরও বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) টুকটুক তালুকদার, রাজশাহী রিভার ভিউ কালেক্টরেট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনোয়ারা পারভিন, রাজশাহী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইজাবেলা সাত্তার, লক্ষ্মীপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইরিন জাফরসহ স্থানীয় অংশীজনেরা।
ইউএনওপিএস বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শিরিন সুলতানা বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইউএনওপিএস স্থানীয়ভাবে পরিচালিত এমন সমাধানকে সমর্থন করছে, যা নারীর নেতৃত্ব এবং স্থানীয় পর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করে। মেন্টরশিপের সুযোগ সৃষ্টি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের মাধ্যমে এসডিজি ৫ ও এসডিজি ১৬ অর্জনের জন্য টেকসই পথ তৈরি করা হচ্ছে।
সভায় জানানো হয়, প্রকল্পের আওতায় স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তরুণ নারী নেতৃত্ব, স্থানীয় থিংক ট্যাঙ্ক, মেন্টরশিপ নেটওয়ার্ক ও উন্নয়ন অংশীদারদের সংযোগ তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব, অধিকার, লিঙ্গসমতা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক ধারণা পাচ্ছে।
বক্তারা বলেন, এসডিজি ৫ লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে এসডিজি ১৬ শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গঠনের লক্ষ্য সামনে আনে। এই দুই লক্ষ্য স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হলে তরুণী ও কিশোরীদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু প্রশিক্ষণ নয়, নেতৃত্বের বাস্তব সুযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রও তৈরি করতে হবে।
অনুষ্ঠানে এসডিজি স্থানীয়করণ মডেলের অর্জন, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, এই মডেল তরুণীদের নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্ব, কমিউনিটি সংলাপ, প্রমাণভিত্তিক প্রচারণা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণকে একসঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে এটি স্থানীয় পর্যায়ে এসডিজি বাস্তবায়নের একটি অনুকরণযোগ্য কাঠামো হিসেবে গড়ে উঠছে।
সভায় বলা হয়, কাউকে পেছনে ফেলে না রেখে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে নারী, তরুণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। এ উদ্যোগ সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথকে আরও শক্তিশালী করছে। রাজশাহী এই মডেলের বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখছে। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, দেশের ৮ স্কুলের নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে এসডিজি মডেল বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। স্থানীয় পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব, যুব অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এ উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হবে এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর অবদান রাখবে।