দাবি না মানলে হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের আন্দোলনের হুশিয়ারি রাবি ছাত্রশিবির সভাপতির
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সৈয়দ আমীর আলী হল সংসদের ভিপি ও ছাত্রশিবির নেতা মো. নাঈম ইসলামের সিট বাতিলের প্রতিবাদ করেছেন রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল। মঙ্গলবার (৩০ জুন) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে করা এক পোস্টে এই প্রতিবাদ জানান তিনি।
পোস্টে হল প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ৪ দফা দাবি জানিয়েছেন তিনি। দাবিগুলো না মানলে প্রভোস্টের পদত্যাগের আন্দোলনে যাওয়ারও হুশিয়ারি দিয়েছেন ছাত্রশিবির সভাপতি।
এর আগে হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য বিনা অনুমতিতে সংগ্রহ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের অভিযোগে সোমবার হল সংসদের ভিপি নাঈম ইসলামের আবাসিকতা বাতিল ঘোষণা করেছিল হল প্রশাসন। সমালোচনার মুখে মঙ্গলবার মো. নাঈম ইসলামের আবাসিকতা বাতিলের আদেশ স্থগিত করা হয়েছে।
ছাত্রশিবির সভাপতির দাবিগুলো হলো- দলীয় বিবেচনায় দেওয়া সিট বাতিল করতে হবে, হলে অবস্থানরত অবৈধ শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দিতে হবে, মেরিট ও ওয়েটিং লিস্ট নোটিশবোর্ডে টাঙিয়ে সিট বণ্টন করতে হবে এবং সৈয়দ আমীর আলী হলের ইন্টারনেট রুম পুনরায় চালু করে দিতে হবে।
পোস্টে রাবি ছাত্রশিবির সভাপতি লিখেছেন, সৈয়দ আমীর আলী হলের প্রভোস্টের নানা অনিয়ম দুর্নীতি এবং ছাত্রদলের নেতাদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সিট দেওয়া বিষয়ে প্রতিবাদ করায় আমীর আলী হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি নাইম ইসলামের আবাসিকতা বাতিল করে হল প্রভোস্ট হারুন অর রশিদ। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন ভিপি অফিসায়াল ডকুমেন্টস ওনার কনসার্নের বাহিরে সংগ্রহ করেছেন। অথচ প্রভোস্ট নিজেই ইতোপূর্বে ২০১৮-১৯ সেশনের অভ্যন্তরীণ প্রাইভেট গ্রুপের কথপোকথন সংগ্রহ করতেন এবং ছাত্রদের সেই স্ক্রিনশট দিয়ে মানসিকভাবে নির্যাতন চালাতেন।
মুজাহিদ ফয়সাল লিখেছেন, এলোটমেন্ট ছাড়া নোটিশ বোর্ডে নোটিশ টানানো ছাড়া এবং কোনো রকম স্কোর উল্লেখ না করে বিদ্যমান নীতিমালার তোয়াক্কা না করে উনি (প্রাধ্যক্ষ) ছাত্রদল নেতাদের দরিদ্র্য কোটায় যে সিট বরাদ্দ দেন সেটি আমীর আলী হলের ইন্টারনেট রুম। হলের সকল শিক্ষার্থীর মতামতকে উপক্ষা করে তিনি ছাত্রদল নেতাদের সম্পূর্ণ দলীয় বিবেচনায় এই অনৈতিক সুবিধা প্রদান করেন। ঈদের ছুটিতে হলের নারিকেল গাছের সব ডাব তসরুপের অভিযোগ উঠেছে হল প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ তুলে শিবির সভাপতি লিখেছেন, রিডিং রুম সংস্কার, ডাইনিং-এ খাবারের মান উন্নতি সহ ছাত্রকল্যাণমূলক কোনো কাজে বা উদ্যোগে প্রভোস্ট হল সংসদকেতো সহযোগিতা করেনই না উপরন্তু বাধা প্রদান করেন প্রতিটি কাজে। আমীর আলী হলের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ হল প্রভোস্ট শিক্ষকসুলভ আচরণ করেন না বরং রাজনৈতিক নেতাদের মত শিক্ষার্থীদের সাথে ব্যবহার করেন। এগুলা বিষয়ে প্রতিবাদ করা শুরু করলে তিনি ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে সম্পূর্ণ অন্যায় এবং অযাচিতভাবে হল সংসদের নির্বাচিত ভিপি নাইম ইসলামের আবাসিকতা বাতিল করেন।
উল্লেখ্য, সৈয়দ আমীর আলী হলের ভিপির সিট বাতিলের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার বিকালেই রাবি ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা এবং হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা উপাচার্যের সাথে সাক্ষাৎ করে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন এবং হল প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবি করেন। এরপর মঙ্গলবার সকালে ভিপির সিট বাতিলের নোটিশ প্রত্যাহার করে নেওয়ার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন হল প্রাধ্যক্ষ।
নতুন আদেশে বলা হয়, নাঈম ইসলাম হল সংসদের একজন নির্বাচিত ভিপি হওয়ায় হল সংসদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও সচল রাখার স্বার্থে সোমবার (২৯ জুন) জারি করা তার আবাসিকতা বাতিলের আদেশ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হলো।
ছাত্রশিবির সভাপতির অভিযোগ ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সৈয়দ আমীর আলী হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হারুনর রশীদের মন্তব্য চাইলে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ছাত্রশিবিরের সভাপতি কি আমীর হলের ছাত্র? সে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র?
এরপর তিনি বলেন, ফেসবুকের যুগে যেকেউ যেকোনো কিছু লিখতেই পারে। তাদেরকেতো আর ফেরানো যাবে না। প্রথমত, আমীর আলী হলের ইন্টারনেট রুম হলো হাউজ টিউটরের রুম। হাউজ টিউটররা সেখানে থাকতে অস্বীকার করায় সিট অপ্রতুলতার এই সময়ে ওই রুমগুলো আমি গণরুম বানিয়ে ছাত্রদের তুলে দিয়েছি। দুইটা হাউজ টিউটর রুমে ৩ জন করে ৬ জন ছাত্র তোলাট ব্যবস্থা করেছি। এর আগের প্রভোস্ট সম্ভবত ওখানে ইন্টারনেটের হাব তৈরী করেছিল। কিন্তু এখন রুমে রুমে ইন্টারনেটের ব্যবস্থা থাকায় হাবের আর কোনো প্রয়োজন নেই।
হল প্রাধ্যক্ষ বলেন, রিডিং রুমের যাবতীয় কাজ আমরা করেছি। এখন এসির লাগানোর কাজটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করে দিবে। আর মেরিট লিস্ট অনুযায়ী আমরা সিট দিয়ে থাকি। এখন সিট বন্টন নীতিমালা অনুযায়ী ১০ শতাংশ সিট প্রভোস্টের হাতে থাকে। সেখানে দরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়। মেরিটের বাইরে একটা সিটও দেওয়া হয় না। স্কোর উল্লেখ করে করে সিট দেওয়া হয়।
২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট গ্রুপের কথপোকথন সংগ্রহ এবং সেই স্ক্রিনশট দিয়ে মানসিকভাবে নির্যাতন চালানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ওইসময় ছাত্রশিবিরের কিছু ছেলেপেলে আমাকে খুব জ্বালিয়েছে। তাঁরা নানাভাবে আমাকে হিউমিলিয়েট করেছে। তাঁরা পাস করার পরেও হল থেকে বের হবে না। তাদেরকে হল থেকে বের করেছি আমি। গত ১৮ জুন আমি ১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার জন্য নোটিশ দিয়েছি। এট পিলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট। এর কোনো ভিত্তি নেই।
হলের নারিকেল গাছের ডাব তছরুপের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা ২৪ সালের ডিসেম্বরের কথা। আমি যখন হলে নতুন জয়েন করি, তখন ট্রেডিশন ছিলো যে হলের ডাবগুলো অফিসাররা পেড়ে নিয়ে নেয়। আমি তখন বলি ফ্রি কোনো কিছু হবে না। এরপর ইদের মধ্যে ডাবগুলো পেড়ে আমরা সবাই টাকা দিয়েই কিনে নিয়েছিলাম। সেই টাকা দিয়ে ছাত্ররা ফিস্টে খাওয়া দাওয়াও করেছে। এধরণের প্রশ্ন কেউ করলে আমরা বিব্রত হই। এরপরেও আরও দুইবার ডাব পাড়া হয়েছে। তখন শিক্ষার্থীরাই ডাব কিনে নিয়েছিল।
এর আগে সোমবার হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য বিনা অনুমতিতে সংগ্রহ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের অভিযোগে হল সংসদের ভিপি নাঈম ইসলামের আবাসিকতা বাতিল করে আগামী ২ জুলাইয়ের মধ্যে হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিল হল প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দরিদ্র কোটায় আবেদন করে হলে ওঠেন হল ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমির হামজা। এই তথ্যটি অফিস থেকে সংগ্রহ করেন ওই হল সংসদের ভিপি নাঈম ইসলাম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন মতিহার হল সংসদের ভিপি তাজুল ইসলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত তথ্য চুরির অভিযোগে হল প্রাধ্যক্ষ বরাবর নাঈম ইসলামের হলের আবাসিকতা বাতিলের আবেদন করেন ওই ছাত্রদল নেতা। এর পরিপ্রেক্ষিতে নাঈমের আবাসিকতা বাতিলের নোটিশ দেয় হল প্রাধ্যক্ষ।