শ্বশুরের গ্রামের ঠিকানায় অধিকাংশ জামাইয়ের স্থায়ী বসবাস
নাটোর জেলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম গুড়মাটিয়া। ইতিহাস, লোককথা, শিক্ষা ও কৃতী সন্তানদের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই গ্রামটি জেলার অন্যতম পরিচিত জনপদ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেখানে মেয়েরা বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে বসবাসকেই স্বাভাবিক রীতি মানে, কিন্তু বড়াইগ্রামের গোপালপুর ইউনিয়নের গড়মাটি গ্রাম এর ব্যতিক্রম। এই গ্রামের অধিকাংশ জামাই বিয়ে করে ওই গ্রামেই স্থায়ী হয়েছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন শ্বশুর বাড়িতে কিংবা ওই গ্রামে।
তবে ‘ঘরজামাইয়ের গ্রাম’ হিসেবে লোকমুখে প্রচলিত নানা গল্প রয়েছে, আবার দেশের প্রশাসন, শিক্ষা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কর্মরত অসংখ্য কৃতী সন্তানের জন্যও গুড়মাটিয়া বিশেষভাবে সমাদৃত। গোপালপুরের ওই গ্রামে মেয়ের জন্মস্থানে স্বামীর এমন ব্যতিক্রমী বসবাস বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। আবার অনেকেই মজা করে ওই গ্রামকে ঘর জামাইদের গ্রাম বলেও সম্বোধন করেন।
নাটোর জেলা সদর থেকে ৪০ কি.মি. দূরে নাটোর-পাবনা মহাসড়ক কোল ঘেষে গ্রামটির অবস্থান। প্রায় ৫০ বছর ধরে ওই গ্রামে জামাইদের বসবাসের এমন রীতি চলে আসছে। স্থানীয়দের দাবি, ওই গ্রামে ছেলে সন্তানের চেয়ে মেয়ে সন্তানের সংখ্যা বেশি। শুধু মেয়ে সন্তান- এমন দম্পতির সংখ্যাও কম নয়। এর বাইরে জামাই আদরসহ নানা কারণে ওই গ্রামে এমন ব্যতিক্রমী রীতি গড়ে উঠেছে।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, বড়াইগ্রাম উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নে মোট ১৩টি গ্রাম। এর মধ্যে পাঁচটি গ্রামে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও অপর আট গ্রামে নারীর সংখ্যা বেশি। যার মধ্যে গড়মাটি গ্রাম অন্যতম। গ্রামটিতে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা থেকে আগতদের স্বায়ীভাবে বসতি। এর মধ্যে পাবনা, সিরাজগঞ্জের নদী ভাঙ্গা লোকের সংখ্যা বেশি। এ গ্রামের মোট জনসংখ্যা ছয় হাজার ৭৫৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ তিন হাজার ১২০ জন। অপরদিকে, নারী তিন হাজার ৬৩৬ জন। ওই ইউনিয়নে শিক্ষার হারও ভালো। যার ফলে এ গ্রামের অনেক সন্তান প্রশাসন ক্যাডারসহ ্ন সরকারি বিভিনগুরুত্বপূর্ণ পদে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের মতে, অতীতে এ অঞ্চলে প্রভাবশালী জমিদার ও রাজপরিবারের সঙ্গে গুড়মাটিয়ার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। সেই ইতিহাসের নানা স্মৃতি, ও লোকজ ঐতিহ্য আজও গ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। এলাকায় মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির বন্ধন সবাইকে মুগ্ধ করে।
সরেজমিন জানা যায়, গড়মাটি গ্রামে অনেক পরিবারেই প্রথম সন্তান মেয়ে। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় স্বাভাবিক কারণেই বাবা-মায়ের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ এসব মেয়ে। এছাড়া অনেক পরিবারের ছেলেরা বিয়ের পর পৃথক সংসার গড়ে বাবা-মায়ের প্রতি তেমন কোন দায়িত্ব পালন না করায় মেয়েদের দিকে মনোযোগ দেন তারা।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে গ্রামটিতে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, একদল নারী- সংসারের কাজের পাশাপাশি কৃষি ফসল রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছেন। আবার কেউবা উঠানে কৃষি ফসল শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
ঘর জামাই শামছুল আলম জানান, তার বাবার জমি-জায়গা না থাকায় ৪০ বছর আগে বিয়ে করে এই গ্রামে শ্বশুর বাড়িতেই ঘর তুলে বসবাস করছি আর নিজের কর্ম নিজে করে খাই।
অপর এক ঘর জামাই হাসেন আলী বলেন, তিনি পাশের গ্রামের সন্তান। বিয়ে করেছে গড়মাটি গ্রামে। শ্বশুর -শাশুড়ি কেউ জীবিত নাই। শ্বশুরের সামান্য ভিটে মাটিতে স্ত্রী ও তিন ছেলে নিয়ে ওই বাড়িতেই প্রায় ৪০ বছর ধরে বাস করেন এবং দিন মুজুরের কাজ করে চলে।
এ গ্রামের আজাদ নামে একজন বলেন, গ্রামে যেমন ‘ঘরজামাইয়ের গ্রাম’- নিয়ে এর গল্প আছে, সমস্যা আছে, আবার এ গ্রামের গৌরবও আছে। এই গ্র্রামের সন্তান ডিসি, সচিব ও বিভিন্ন দপ্তরের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন।
গ্রামের আরেক যুবক মোশারফ বলেন, তার বোন-ভাগ্নিদের বিয়ে দিয়েছে, গরীব ও কর্মজীবী ছেলে দেখে। এই এলাকায় বারো মাসই কাজ আছে। জামাইরা আশয়্র নেয়ার পরই তারা উপার্জন শুরু করে, অনেকেই স্বাবলম্বী। এমন না সবাই ঘর জামাই থাকে।
এক ঘর জামাই জানান, ওই গ্রামে অধিকাংশ জামাই বসবাস করেন। তবে প্রথম দিকে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করলেও কেউ কেউ পরে শ্বশুরের দেওয়া বা নিজের কেনা জমিতে পৃথক বাড়ি করে বসবাস করছেন। আবার যেসব পরিবারে ছেলে সন্তান নেই, এমন পরিবারে অনেক জামাই দায়িত্ব পালনের জন্য শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে তাদের বাড়িতেই থাকেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জাহিদুল হক সেলিম বলেন, এই গ্রাম পুরাতন ও ঐতিহ্যবাহী গুড়মাটিয়া গ্রাম, এ গ্রামে বিভিন্ন এলাকা থেকে নদী ভাঙ্গা গাং ভাঙ্গা লোকের ৩০-৪০ বছর পৃর্ব থেকে বসবাস করে। সব গ্রামেই কম-বেশি ঘরজামাই থাকে, ফেইসবুকে, সাংবাদিকরা ঢালাওভাবে প্রচার করেছে ঘরজামাইয়ের গ্রাম, আসলে তা না। গ্রামটি পূর্বসূত্রে রাণী নগর, এখন রানীবাড়ি মৌজা। এখনো কিছু কিছু কাগজ কলমে ছোট রানীবাড়ি, বড় রানীবাড়ি লেখা আছে।
গোপালপুর ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুস সামাদ মণ্ডল জানান, ছয়-সাতদিন আগে ফেইসবুকে একটি অবাস্তব কথা ছড়িয়েছে, যা সত্য না। আসলে ঘরজামাই পাড়া বলতে কী বুঝায়? যে গ্রামে স্থানীয়দের বসবাস, সেখানে জামাইপাড়া বা ঘরজামাইয়ের গ্রাম- এটা সত্য না। গড়মাটি অনেক বড় গ্রাম। যেখানে পাবনা, সিরাজগঞ্জ থেকে অনেক নদীভাঙ্গা লোক এসে বাস করছেন। কিছু দিন আগে জায়গা সংক্রান্ত বিষয়ে একটা পক্ষ ডিগ্রি পায় সেখানে উৎসব করে খিচুড়ি খাওয়ার আয়োজনে কেউ একজন হাস্যরসাত্মক করে বলেছে এটা ‘ঘড় জামাই পাড়া’।
এ গ্রামের সবাই শান্তিপ্রিয়। সবাই মিলেমিশে বসবাস করেন। অনেক জামাইয়ের নাতি-নাতনিরা বড় হয়েছে। তাদের কাছে ওই গ্রামই নিজেরই গ্রাম। কোন ধরনের সমস্যা ছাড়াই এ যাবৎ ছোট-বড় নারী-পুরুষ শ্বশুর-জামাই সবাই সবার সঙ্গে শ্রদ্ধা ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এই গ্রামে বসবাস করছেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, গুড়মাটিয়ার ইতিহাস, কৃতী ব্যক্তিদের অবদান এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই গ্রামের গৌরবময় অতীত সম্পর্কে আরও সমৃদ্ধ ধারণা লাভ করবে।