শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

বাগানমালিকদের ‘জিম্মি’ করে শতকোটি টাকার আম হাতিয়ে নিচ্ছেন আড়তদাররা

নিজস্ব প্রতিবেদক ০১ জুলাই ২০২৬ ১১:০২ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০১ জুলাই ২০২৬ ১১:০২ অপরাহ্ন
বাগানমালিকদের ‘জিম্মি’ করে শতকোটি টাকার আম হাতিয়ে নিচ্ছেন আড়তদাররা

নিয়মানুযায়ী ৪০ কেজিতে এক মণ। অথচ রাজশাহীতে আম বিক্রির ক্ষেত্রে আড়তদাররা নিচ্ছেন প্রতি মণে ৪৮ থেকে ৫২ কেজি। ফলে, প্রতি মৌসুমে শত কোটি টাকার আম বিনামূল্যে চলে যাচ্ছে আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের হাতে। এতে লাভের বদলে লোকসানে বাগানিরা।


সম্প্রতি জেলা প্রশাসন আম বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে ও ঢলন প্রথা বাতিলে উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্যে কমিটি গঠন করেছে।


বানেশ্বর বাজার ঘুরে দেখা যায়, রাজশাহীর বানেশ্বর-ঈশ্বরদী আঞ্চলিক মহাসড়ক। বানেশ্বর বাজার অংশে সড়কের ওপর আমের জমজমাট বাজার। মৌসুমের ভরা সময়ে আম বিক্রির প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রক পাইকার ও আড়তদার।


মঙ্গলবার (৩০ জুন) বানেশ্বরের সোহাগ হোসেন স্থানীয় একটি আড়তে ৪০ মণ ফজলি আম বিক্রি করেন। এজন্য ঢলন বাবদ তাকে ৩২০ কেজি বা ৮ মণ আম বিনামূল্যে দিতে হয় আড়তদারকে। এছাড়া প্রতিটি ক্যারেট দেড় কেজি হলেও ওজন বাদ দেয়া হয় তিন কেজি। সবমিলিয়ে বাড়তি আম দিতে হয় ১০ মণেরও বেশি।


বানেশ্বরের সোহাগ হোসেন জানান, ৪০ মন আমে, প্রতি মণে ৮ কেজি হিসেবে ঢলন বাবদ নিয়েছে ৩২০ কেজি। ক্যারেটের ওজনে বেশি নিয়েছে ১০০ কেজির মতো। এছাড়াও ফাটা, পাকা, রং এর কারণেও আম বেশি নিয়েছে।


কৃষকরা বলছেন, প্রতিমণে নির্ধারিত ওজনের চেয়ে দুকেজি অতিরিক্ত আম বাড়তি দেয়ার প্রচলন দীর্ঘদিনের। সেই ঢলন এখন অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে ৪০ কেজির দামে ৫০ কেজি পর্যন্ত আম নিচ্ছেন আড়তদাররা। বিভিন্ন মোকাম ও পাইকারি বাজারে কৃষকদের ৪০ কেজির (এক মণ) পরিবর্তে ৫০ থেকে কেজি পর্যন্ত আম দিতে হচ্ছে। তবে মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে মাত্র ৪০ কেজির হিসাবেই। ফলে প্রতি মৌসুমে শতকোটি টাকার আম বিনামূল্যে চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের হাতে।


আম বাগানি মুকুল বলেন, পচনশীল হওয়ায় এবং সরবরাহ বেশি থাকায় কৃষকরা বাড়তি আম দিতে বাধ্য থাকেন। একদিকে উৎপাদন ব্যয় বেশি, অন্যদিকে ঢলন, সবমিলিয়ে লাভের বদলে ক্ষতিতে কৃষক।


তিনি বলেন, বেশিরভাগ ব্যবসায়ী অতিরিক্ত ওজন ছাড়া আম কিনেন না। যেহেতু তারা সিন্ডিকেট করে ব্যবসা করেন, সেকারনে বাধ্য হয়েই লোকসান মেনে বিক্রি করতে হয়।


বানেশ্বরের আম বাগানি সাগর ইসলাম বলেন, ঢলন প্রথা আমচাষিদের লাভের বড় অংশ কেড়ে নিচ্ছে। ঢলন না থাকলে কৃষকরা কিছুটা হলেও লাভের মুখ দেখতো।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার ব্যবস্থার নানা অসঙ্গতির কারণে সুফল পাচ্ছেন না চাষিরা। বরং আম বিক্রির সময় তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।


ব্যবসায়ীদের দাবি, পরিবহন ও সংরক্ষণজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা ঢলন নিচ্ছেন। একাধিক ব্যবসায়ী জানান, সব আমের আকার, রং ও গুনগত মান এক নয়। ফলে ঢলন নিয়ে সমন্বয় করা হয়।


রাজশাহী কৃষি বিভাগের হিসেবে এবার প্রায় ৮০০ কোটি টাকার আম-বাণিজ্য হবে। সংশ্লিষ্টদের অভিমত,  এই বাণিজ্যে দুইশ কোটি টাকার আম বিনামূল্যে পাচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা। আর প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত বাগানিরা।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, আম পচনশীল পণ্য হওয়ায় যখন ভরা মৌসুম তখন এমনিতেই দাম কম হয়। মধ্যস্বত্বভোগীরা সেই সুযোগ নিয়ে দাম কম দিচ্ছেন, আবার ওজনেও ঠকাচ্ছেন। এটা অনৈতিক। একদিকে কম দাম, অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজন, খাজনার নামে বাড়তি টাকা সবমিলিয়ে প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক।


সম্প্রতি মহাসড়কের ওপর থেকে বাজার সরিয়ে নেয়া, ঢলন প্রথা ও বাড়তি খাজনা আদায় বন্ধে সভা করেছে জেলা প্রশাসন। গঠিত হয়েছে ৭ সদস্যর কমিটি। এ কমিটির আহ্বায়ক রাজশাহী পুঠিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবু দাস। তিনি বলেন, আমরা কৃষক, আড়তদার, ব্যাপারী, হাটের ইজারাদার, পুলিশ সবপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর একমাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিবো। তারই আলোকে নেয়া হবে ব্যবস্থা।


বর্তমানে বাজারে আম্রপালি, লক্ষনভোগ, ফজলি আমের সরবরাহ ভালো। বারো’শ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা প্রতিমণ দরে এসব আম বিক্রি হচ্ছে।