সরকারের উপহারে রত্নার মুখে হাসি, সহজ হলো স্কুলযাত্রা
প্রতিদিন বাড়ি থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো স্কুলছাত্রী রত্না বিশ্বাসকে। রাজশাহীর পবা উপজেলার খৃষ্টানপাড়া এলাকার বাসিন্দা রত্না ইউসেফ রাজশাহী টেকনিক্যাল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা পেশায় রাজমিস্ত্রি। অভাবের সংসারে মেয়ের জন্য একটি বাইসাইকেল কেনা ছিল পরিবারের কাছে প্রায় অসম্ভব। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পায়ে হেঁটেই স্কুলে যাতায়াত করতে হতো রত্নাকে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে একটি বাইসাইকেল পেয়ে রত্নার সেই কষ্ট এবার অনেকটাই দূর হয়েছে।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সকালে পবা উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে আয়োজিত বাইসাইকেল, শিক্ষাবৃত্তি ও সেলাই মেশিন বিতরণ অনুষ্ঠানে নতুন সাইকেল পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে রত্না বিশ্বাস। অনুভূতি জানাতে গিয়ে রত্না বলে, “আমার বাবা একজন রাজমিস্ত্রি এবং আমরা খুবই গরিব। বাবার পক্ষে আমাকে সাইকেল কিনে দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। হেঁটে আসতে আমার স্কুলে এক ঘণ্টা দেরি হয়ে যেত। এখন সরকারের পক্ষ থেকে সাইকেল পেয়ে আমি ভীষণ খুশি। এখন আমি মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই স্কুলে চলে আসতে পারব।” রত্না বিশ্বাস জানায়, দীর্ঘ পথ হেঁটে স্কুলে যেতে গিয়ে প্রায়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ত সে। অনেক সময় সময়মতো স্কুলে পৌঁছানো সম্ভব হতো না।
এতে ক্লাসের পড়াশোনাতেও সমস্যা হতো। এখন সাইকেল পাওয়ায় নিয়মিত ও সময়মতো স্কুলে যেতে পারবে বলে আশা করছে সে। রত্না বলে, “যাতায়াতের কষ্ট দূর হয়েছে, এখন আমি আরও ভালোভাবে এবং মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করব।” শুধু রত্না বিশ্বাস নয়, একই অনুষ্ঠানে কশবা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ইমন টুডুও পেয়েছে নতুন বাইসাইকেল। তাকেও দীর্ঘদিন ধরে পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হতো। দরিদ্র বাবার পক্ষে ছেলেকে একটি সাইকেল কিনে দেওয়া সম্ভব ছিল না। নতুন সাইকেল পেয়ে ইমন ও তার পরিবারও আনন্দ প্রকাশ করেছে।
এখন থেকে ইমন সাইকেল চালিয়ে সহজে স্কুলে যেতে পারবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন। তিনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাইসাইকেল, শিক্ষাবৃত্তি ও সেলাই মেশিন বিতরণ করেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, সরকার প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করতে কাজ করছে। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একটি বাইসাইকেল একজন শিক্ষার্থীর স্কুলে যাতায়াত সহজ করার পাশাপাশি তার শিক্ষাজীবনে নতুন প্রেরণা যোগ করতে পারে। তিনি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে নিজেদের যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে এসব সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বাইসাইকেল ও শিক্ষাবৃত্তি তাদের পড়াশোনার পথকে আরও সহজ করবে। পাশাপাশি সেলাই মেশিন ও বসতঘর সহায়তা পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
এসব সহায়তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় তদারকি করবে বলেও জানান তিনি। সভায় সভাপতিত্ব করেন পবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইবনুল আবেদীন। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, সরকারের উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো হচ্ছে। এসব সহায়তা শুধু তাৎক্ষণিক সহযোগিতা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি সহায়তাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যদের এসব উপকরণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পবা উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে ১৮ জন শিক্ষার্থীকে বাইসাইকেল, ১২ জনকে সেলাই মেশিন, ৪ জনকে বসতঘর এবং ১২০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। এসব খাতে মোট ২৭ লাখ ১১ হাজার টাকার উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি রাজ কুমার শাও, পবা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রাজ্জাক ও যুগ্ম আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ।