শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

গোল হলে কাঁপছে পাড়ার মোড়

ইরম তারান্নুম প্রজ্ঞা ০৩ জুলাই ২০২৬ ১০:৫১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
ইরম তারান্নুম প্রজ্ঞা ০৩ জুলাই ২০২৬ ১০:৫১ অপরাহ্ন
গোল হলে কাঁপছে পাড়ার মোড়

গোলের মুহূর্তটা আসতেই যেন থমকে যায় সময়। পরক্ষণেই বিস্ফোরণ বাঁশির তীব্র শব্দ, হাততালির ঝড়, আর এক সঙ্গে ছুটে ওঠা শত কণ্ঠের উল্লাস। রাজশাহী মহানগরীর পাড়াসহ গ্রামের মোড়ে মোড়ে এখন এমনই দৃশ্য। বিশ্বকাপের ম্যাচ মানেই শুধু টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখা নয়, এটি হয়ে উঠেছে পাড়া-প্রতিবেশী, পরিবার আর বন্ধুবান্ধবের মিলনমেলা।


রেডিও-টেলিভিশনের যুগ পেরিয়ে এখন প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে মোড়ের আড্ডায়। পাড়ার চায়ের দোকানে, মুদি দোকানে কিংবা খোলা মাঠে বসানো হচ্ছে বড় পর্দা। কেউ নিজের বাসা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে এনেছে, কেউ আবার সাউন্ড বক্স বসিয়ে দিয়েছে। চারপাশে উড়ছে রঙিন পতাকাÑ কারও হাতে প্রিয় দলের পতাকা, কারও কপালে মুখরঙ। শিশুদের চোখে উচ্ছ্বাস, কিশোরদের কণ্ঠে স্লোগান, আর বয়স্কদের চোখে ফিরে দেখা পুরোনো দিনের ফুটবল স্মৃতি।


ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই শুরু হয় আলোচনা। কে জিতবে, কে গোল করবে এই নিয়ে তর্ক চলে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে। খেলা যত এগোয়, উত্তেজনাও বাড়ে। গোল মিস হলে এক সঙ্গে হতাশার দীর্ঘশ্বাস, আর গোল হলে মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্য। কেউ পতাকা নাড়িয়ে দৌড়াচ্ছে, কেউ রঙ খেলছে একে অপরের গালে, কেউ আবার বাঁশি বাজিয়ে জানান দিচ্ছে গোল হয়েছে।


এই ফুটবল উন্মাদনা শুধু খেলা দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি রূপ নিয়েছে এক সামাজিক উৎসবে। এই ফুটবল উৎসব শুধু তরুণদের মধ্যে ও সীমাবদ্ধ নেই। অনেক পরিবার একসাথে বেরিয়ে এসেছে। বাবা-মায়ের হাত ধরে ছোট শিশুরা শিখছে উল্লাসের ভাষা। বাবা তার সন্তানকে কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রজেক্টরের সামনে, বন্ধু হাত ধরে টেনে আনছে আরেক বন্ধুকে। নারীরাও সমানভাবে অংশ নিচ্ছেন—কেউ স্লোগান দিচ্ছেন, কেউ আবার মোবাইলে ভিডিও ধারণ করছেন স্মৃতি ধরে রাখার জন্য। ম্যাচের ফাঁকে ফাঁকে শোনা যায় হাসি, গল্প, আর হালকা খুনসুটি।


রাজশাহীর সাহেববাজার, ভদ্রা, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, আলুপট্টি, সিঅ্যান্ডবি মোড়, বর্ণালীসহ প্রায় সব জায়গায় এই দৃশ্য এখন প্রতিদিনের। নগরীর ব্যস্ততা যেন কিছু সময়ের জন্য থেমে যায় ফুটবলের কাছে। পড়াশোনা, কাজের চাপ, দৈনন্দিন দুশ্চিন্তাÑসব পেছনে ফেলে মানুষ এখানে আসে এক টুকরো আনন্দের খোঁজে। ফুটবল এখানে শুধুই খেলা নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক বন্ধন, যা অচেনাকেও চেনা করে তোলে।


ম্যাচ শেষ হলে ধীরে ধীরে ফাঁকা হয় মোড়। কিন্তু রেশ থেকে যায় দীর্ঘক্ষণ। আলোচনায় ফিরে আসে গোলের মুহূর্ত, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, কিংবা শেষ মিনিটের উত্তেজনা। পরের ম্যাচের অপেক্ষা শুরু হয়ে যায় তখনই।


খেলা দেখার এই জোয়ারে যেমন সাধারণ মানুষের বিনোদন হচ্ছে, তেমনি চা-নাস্তা বা টুপি-পতাকা বিক্রেতাদের পকেটেও আসছে বাড়তি আয়। উৎসবের এই রাতগুলো শুধু আবেগের নয়, বরং শহরের ক্ষুদ্র অর্থনীতির চাকার গতি বাড়ানোরও এক বড় উপলক্ষ। গোল হলে কাঁপছে পাড়ার মোড়—এই কাঁপুনি আসলে আনন্দের, ঐক্যের। রাজশাহীর মোড়ের মোড়ে ফুটবল আবারও প্রমাণ করছে, একটুখানি খেলা কীভাবে পুরো শহরকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলতে পারে।


ব্যাংক কর্মকর্তা মাহমুদ রনি বলেন, ঘরের চার দেওয়ালে বসে টিভি দেখার চেয়ে বন্ধুবান্ধব, ভাই-ব্রাদারসহ প্রজেক্টরে খেলা দেখতে আসার মজাই আলাদা। এখানে আসলে পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে দেখা হয়, গল্প হয়। সারাদিন কাজের চাপে পরিবারকে সময় দেওয়া হয় না। কিন্তু খেলা দেখার অজুহাতে সবাই এক সঙ্গে বের হয়েছি। বাচ্চারা খুব আনন্দ করছেÑএটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।


সাকিবুল ইসলামের এক শিক্ষার্থী বলেন, বন্ধুরা মিলে খেলা না দেখলে মজাই হয় না। গোল হলে সবাই চিৎকার করি, হাসি। যখন পড়ালেখা শেষ হয়ে যাবে সবাই আলাদা হয়ে যাব এই মুহূর্তগুলোই মনে পড়বে।


বর্ণালী মোড়ের চা বিক্রেতা রবিন বলেন, অন্যান্য সময়ে রাত ১১টার পর দোকান বন্ধ করে দিতে হয়, বেচাকেনাও কমে যায়। কিন্তু খেলার সময় দিন রাত ২টা, ৩টা, ৫ টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। প্রজেক্টরের সামনে ভিড় থাকায় চা, সিগারেট, বিস্কুট  আর বনরুটি নিমেষেই শেষ হয়ে যায়। এই সময়টা আমাদের ব্যবসার জন্যও ভালো। পাশাপাশি সবার সাথে খেলা দেখতে ভালোই লাগে।


মালিহা খন্দকার নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এক সময় ভাবা হতো খেলাধুলা বা মোড়ের আড্ডা মানেই শুধু ছেলেদের জায়গা। কিন্তু এখন রাজশাহীর পরিবেশ অনেক বদলেছে। আমরা বান্ধবীরা মিলে, আবার পরিবারের সঙ্গে এসে খেলা দেখছি। আগে এইভাবে কখনো খেলা দেখা বা আনন্দ করা হয় নি। এইবার খুবই ভালো লাগছে।