চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ২০ জনকে পুশইনের চেষ্টা বিএসএফের, ঠেকাল বিজিবি
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে আবারও বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা হয়েছে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় গ্রামবাসীর যৌথ তৎপরতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগে থেকেই সীমান্তে নজরদারি জোরদার, অতিরিক্ত টহল এবং স্থানীয়দের সতর্ক অবস্থানের কারণে সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
শুক্রবার (৩ জুলাই) রাত প্রায় ১১টার দিকে শিবগঞ্জ উপজেলার চকপাড়া বিওপির বিপরীতে ভারতের অভ্যন্তরে ১৮৩/৩-এস আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার থেকে প্রায় ৬০০ গজ দূরের মুসলিমপাড়া এলাকায় সন্দেহজনক তৎপরতার খবর পাওয়া যায়। একই সময়ে ওই এলাকায় সীমান্তের বর্ডার সিকিউরিটি লাইটও বন্ধ ছিল। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ১২ জন ব্যক্তি অবস্থান করছিলেন, যাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল বলে ধারণা করা হয়।
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি) সীমান্তে অতিরিক্ত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং সতর্কতা বাড়ায়। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদেরও সতর্ক করা হয়। বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত অবস্থানের কারণে সম্ভাব্য অনুপ্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।
পরে শনিবার (৪ জুলাই) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে গোয়েন্দা সূত্রে বিজিবি জানতে পারে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) নিজস্ব যানবাহনে ওই ব্যক্তিদের মালদা হোল্ডিং সেন্টারে নিয়ে গেছে। ফলে সীমান্ত দিয়ে কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “সব ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সীমান্তে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও সতর্কতা আরও জোরদার করা হয়েছে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত প্রায় দুই মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে একাধিকবার নারী, পুরুষ ও শিশুসহ বিভিন্ন দলকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তবে প্রতিবারই বিজিবির কঠোর অবস্থান এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর সহযোগিতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকা সীমান্তে ২০ জুন সবচেয়ে আলোচিত পুশইনের ঘটনা ঘটে। সেদিন ভোরে ভারতের মালদা জেলার সুখদেবপুর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা ১৭৭/২-আর আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারসংলগ্ন এলাকা দিয়ে ১১ জন নারী, ৫ জন পুরুষ ও ৪ শিশুসহ মোট ২০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে।
খবর পেয়ে বিজিবি দ্রুত সীমান্তে অবস্থান নেয়। স্থানীয় গ্রামবাসীরাও বিজিবির সঙ্গে যোগ দিয়ে মানবপ্রাচীর গড়ে তোলেন। প্রায় ছয় ঘণ্টা ওই ব্যক্তিরা শূন্যরেখায় অবস্থান করেন। পরে বিজিবি ও বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে একাধিক দফা পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
এর আগে ১৫ জুন রাতে গোমস্তাপুর উপজেলার রোকনপুর সীমান্ত দিয়ে এক নারীকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়রা তাকে আটক করে বিজিবির হাতে তুলে দেন। যাচাই-বাছাই শেষে বিজিবি তাকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে ফিরিয়ে দেয়।
এ ঘটনায় ওই নারীকে বাংলাদেশে প্রবেশে সহায়তার অভিযোগে রোকনপুর গ্রামের সাতজনকে আটক করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। ঘটনাটি সীমান্তে দালালচক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
গত ১৩ জুন দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে একই উপজেলার রোকনপুর সীমান্ত দিয়ে নদীপথ ব্যবহার করে আরও ১৫ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন ৮ জন নারী, ২ জন পুরুষ ও ৫ জন শিশু।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে থাকা বিজিবি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাধা দেয়। প্রায় দুই ঘণ্টার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির পর রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের ভারতের ভবানীপুর সীমান্ত এলাকা দিয়ে নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
চলতি সময়ের সবচেয়ে বড় পুশইনের ঘটনা ঘটে ৪ জুন ভোররাতে গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে। ওইদিন ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী ও ৬ শিশুসহ মোট ২৮ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে বিজিবি দ্রুত সীমান্তে পৌঁছে বাধা দিলে ওই ব্যক্তিরা টানা তিন দিন শূন্যরেখায় অবস্থান করেন। পরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আলোচনার পর বিএসএফ তাদের আবার ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নেয়।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দুই মাসে অন্তত চারটি পৃথক ঘটনায় ৬০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর সীমান্তজুড়ে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ আরও বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো সন্দেহজনক তৎপরতা দেখা দিলে দ্রুত বিজিবিকে জানানো যায়।
সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর তারা বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। অনেক এলাকায় রাতের বেলায় স্বেচ্ছাসেবী পাহারার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
রোকনপুর এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “সীমান্ত এলাকায় সবাই এখন অনেক বেশি সতর্ক। বিজিবির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে গ্রামবাসীরাও পাহারা দিচ্ছে। যেকোনো অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সবাই একসঙ্গে কাজ করছি।”
বিজিবি জানিয়েছে, বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত রয়েছে। তবে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানবপাচার কিংবা সীমান্ত অতিক্রমের অপচেষ্টা প্রতিরোধে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ আরও জোরদার করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু বিজিবির টহলই নয়, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা ও অংশগ্রহণও অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতেও এই যৌথ উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে ব্যক্ত করেছেন।