চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫০ আসনের হাসপাতালের ডাক্তার ট্রান্সফার ও বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর সেতুতে টোল ইস্যুকে কেন্দ্র করে সদর আসনের বিএনপির সাবেক এমপি হারুনুর রশিদ সাথে প্রতিপক্ষ সদর আসনের জামায়াতের এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুলের পাল্টাপাল্টি অবস্থান নেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক বদলি এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা-ভ্যানের টোল আদায়কে কেন্দ্র করে জেলা রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক বদলি নিয়ে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হারুনুর রশীদের বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ সদর আসনের জামায়াত সমর্থিত সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল। একই সময়ে টোলবিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে জামায়াতের প্রকাশ্য সমর্থন এবং বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ কর্মসূচি দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। ফলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দুটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
গত ১ ও ২ জুলাই মহানন্দা নদীর ওপর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতুর বারঘরিয়া এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যানের টোল প্রত্যাহারের দাবিতে টানা দুই দিন মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন জামায়াত সমর্থিত বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মী ও চালকরা। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে দূরপাল্লার যানবাহন, পণ্যবাহী ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং শত শত যাত্রীকে দুর্ভোগে পড়তে হয়। আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, নিম্নআয়ের চালকদের কাছ থেকে টোল আদায় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অবিলম্বে এই টোল ব্যবস্থা বাতিল করে ছোট যানবাহনগুলোকে টোলমুক্ত ঘোষণা করতে হবে।
টোলবিরোধী এই আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের জামায়াত সমর্থিত সংসদ সদস্য ড. মাওলানা কেরামত আলী আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বলেন, প্রান্তিক অটোরিকশা ও ভ্যানচালকদের কাছ থেকে টোল আদায় জনস্বার্থবিরোধী এবং এটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত। একই সঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারাও বিভিন্ন সময়ে টোলের নামে চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছেন। অন্যদিকে, বিএনপির সহযোগী সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, টোলবিরোধী কর্মসূচির আড়ালে মহাসড়ক অবরোধ করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে হাসপাতাল ও টোল, দুই ইস্যুই এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এ ঘটনার পর ৩ জুলাই জেলা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল যৌথ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করে, টোল প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধনের নামে মহাসড়ক অবরোধ করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করে, কর্মসূচিতে সরকারপ্রধানকে নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। এর প্রতিবাদে সংগঠনগুলো পরদিন সকালে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি পালন করে।
এদিকে, হাসপাতাল ইস্যুতে সম্প্রতি জেলা ২৫০ শয্যা হাসপাতাল পরিদর্শনের পর সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ দাবি করেন, সরকারি হাসপাতালে কর্মরত থেকেও হাসপাতালের সামনের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে মালিকানা (শেয়ার) রেখে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পাঁচ চিকিৎসককে বদলি করেছেন।
তিনি বলেন, সরকারি দায়িত্বে অবহেলা কিংবা নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে কোনো অনিয়ম বরদাশত করা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা নুরুল ইসলাম বুলবুল এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, হাসপাতালটি সুষ্ঠুভাবেই পরিচালিত হচ্ছিল। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চিকিৎসকদের বদলি করানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি জাতীয় সংসদেও উত্থাপন করেছেন তিনি।
পরে এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, হাসপাতাল নিয়ে কাউকে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। তিনি অভিযোগ করেন, জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা হলে তা প্রতিহত করা হবে।
এর জবাবে বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদও বলেন, সরকারি হাসপাতালের কোন চিকিৎসক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং হাসপাতালে চিকিৎসা বাদ দিয়ে নিজস্ব চেম্বারে রোগ দেখলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এছাড়া হাসপাতালকে কোননোভাবেই রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে, হাসপাতালের চিকিৎসক বদলি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত পৃথক কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। বদলি হওয়া চিকিৎসকদের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, টোল ইস্যুতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা না আসায় আন্দোলনকারীদের দাবির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও জাহাঙ্গীর সেতুতে টোল, এই দুই ইস্যুকে কেন্দ্র করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রতিযোগিতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও কর্মসূচির পরিবর্তে হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন, টোল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জনভোগান্তি নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে জনগণের উপকার হবে।