কেশরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রিক ভিডিওর জট খুলছে
মোহনপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেশরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি বর্তমানে প্রায় ১০৬ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার অন্যতম এবং সুনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এ বিদ্যালয়টি ঘিরে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে এসেছে।
ভিডিওতে অভিযোগ করা হয়, বিদ্যালয়ে আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিশুদের ভর্তি নেওয়া হয় না। অভিযোগটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তবে ভিডিওটির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অনেকেই।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় গত বুধবার (০৮ জুলাই) মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাহিমা বিনতে আক্তার আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার (জুলাই) ঘটনাস্থলে গিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযোগের পেছনে ভিন্ন বাস্তবতার তথ্য পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কেশরহাট পৌর এলাকার রায়ঘাটি গ্রামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি তার হাফিজিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত সন্তানকে কেশরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করানোর জন্য যান। ভর্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকরা শিশুটির বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে প্রাথমিক দক্ষতা যাচাই করেন। কিন্তু শিশুটি সন্তোষজনক ভাবে পড়তে না পারায় শিক্ষকরা তাকে প্রথমে দুই মাস নিয়মিত বিদ্যালয়ে ক্লাস করার পর ভর্তি উপযোগী হলে ভর্তি নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে ওই অভিভাবক তাৎক্ষণিকভাবে ভর্তি করানোর জন্য অনড় অবস্থান নেন।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি তার ছেলেকে ভর্তি করাতে না পেরে বাড়ির পাশের কয়েকজন আদিবাসী নারীকে ডেকে সাংবাদিকের সামনে বক্তব্য দিতে বলেন। পরে সেই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ভিডিওতে বক্তব্য দেওয়া তিন নারীর কেউই চলতি বছরে নিজেদের সন্তানকে কেশরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে যাননি।
তাদের মধ্যে দোলাল রায়ের স্ত্রী চম্পা জানান, তিনি দীর্ঘ তিন বছর বাগমারা উপজেলার বাবার বাড়িতে ছিলেন এবং মাত্র তিন মাস আগে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন। বাড়িতে ফিরে অন্যদের কাছ থেকে শুনেছেন যে তাদের সম্প্রদায়ের শিশুদের বিদ্যালয়ে ঠিকমতো ভর্তি নেওয়া হয় না। সেই কথা শুনেই তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দেন।
জোসনা (৩৭), স্বামী সঞ্জীব বলেন, তার নিজের ভর্তি-উপযোগী কোনো সন্তান নেই। তবে তার বোনের সন্তানদের ভর্তি করাতে গিয়ে সমস্যার কথা শুনে তিনি ক্যামেরার সামনে অভিযোগ করেন।
রূপালি (২৬), পিতা গণেশ, স্বামী রিমন জানান, তিনি বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। লোকমুখে শুনেছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকরা ভালো ব্যবহার করেন না এবং ভর্তি নিতেও অনীহা দেখান। সেই ধারণা থেকেই তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দেন।
অনুসন্ধানের সময় তিনজনই স্বীকার করেন, তারা কেউই চলতি বছরে নিজেদের সন্তানকে ওই বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে যাননি। তারা আরও জানান, এলাকার কয়েকজন মুসলিম ব্যক্তি তাদের কাছে এসে জানতে চান আদিবাসী শিশুদের ভর্তি নেওয়া হয় কি না। পরে অন্যদের কাছ থেকে শোনা তথ্যের ভিত্তিতেই তারা ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দেন।
তবে অনুসন্ধানে স্থানীয় কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদ্যালয়ের দুই-একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আদিবাসী শিশুদের প্রতি অনীহা দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় রায়ঘাটি গ্রামের বাসিন্দা ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য মামুন অর রশিদ বলেন, “কেশরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতীতেও অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছে এবং এখনও অনেকেই অধ্যয়নরত রয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবেও তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে সহযোগিতা করি। কারণ আমার বাড়ি আদিবাসী পাড়ার পাশেই একই গ্রামে। একটি বিভ্রান্তিকর ঘটনার কারণে বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও বিব্রতকর।”
অভিযোগ প্রসঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মুরশিদা খাতুন বলেন, “আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ভর্তি না নেওয়ার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বিদ্যালয়ে সব শিশুকেই সমান অধিকার ও সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ভর্তি নেওয়া হয়। অতীতে অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করেছে। বর্তমানে তৃতীয় শ্রেণিতে দুইজন এবং প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে দুইজন আদিবাসী শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ভবিষ্যতেও যে কোনো শিশু ভর্তি হতে চাইলে নিয়ম অনুযায়ী তাকে ভর্তি নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয়দের মতে, ভাইরাল ভিডিওটি বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়াতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে আরও কার্যকর যোগাযোগ ও পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
জানতে চাইলে মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, “আমি প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাকে বলেন, এখানে ইতিমধ্যে চারজন আদিবাসী শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছে এবং ভর্তির রেজিস্টারও তিনি আমাকে দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে আমি আদিবাসী পাড়ায় যাই। যারা ভর্তি হতে পারেনি অথবা অকৃতকার্য হওয়ার পরে একই ক্লাসে ভর্তি নেয়নি, তাদের তালিকা আমাকে দিতে বলি। আজকে পর্যন্ত তারা আমাকে কোনো তালিকা দিতে পারেনি। যদি এ ধরনের কোনো তালিকা পাওয়া যায়, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।